ইউরিয়া বা নন প্রোটিন নাইট্রোজেন

ইউরিয়া বা নন প্রোটিন নাইট্রোজেন হলো গবাদিপশুর প্রোটিনের অপ্রচলিত উৎস। আমাদের দেশের সাধারণ খামার পর্যায়ে গরু মোটাতাজাকরণ করতে ইউরিয়া সারের ব্যবহার খুবই কম। কেননা ইউরিয়া ব্যবহার ঝুকিপূর্ণ ও ঝামেলার বলে মনে করে সবাই। অথচ সারা পৃথিবীতে গরু মোটাতাজাকরণ করতে এটি ব্যপক ব্যবহার হয়। আমাদের দেশেও এর ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তর ও বিভিন্ন NGO ইউরিয়া প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধিতে কাজ করছে।

গরু মোটাতাজাকরণ করতে কেন ইউরিয়া খাওয়াবেন?

ইউরিয়া বা নন প্রোটিন নাইট্রোজেন

ইউরিয়া এক ধরনের রাসায়নিক সার। আমাদের দেশের পশু খাদ্যে বিশেষ করে খড়ে আমিষের পরিমাণ খুব কম, কিন্তু দ্রুত বৃদ্ধিতে আমিষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। পশুকে যে খড় আমরা খাওয়াই তাতে খুব সামান্য পরিমাণ আমিষ জাতীয় খাদ্য বা প্রটিন আছে।

পক্ষান্তরে ইউরিয়া সারে ২৪৫% ক্রুড আমিষ আছে।

স্বল্পমূল্যে খড়ে উচ্চ ক্ষমতাপূর্ণ আমিষের সঙ্গে মিশিয়ে খড়ে আমিষের পরিমাণ অনেকাংশে বাড়ানো যায়। এ ধরনের ইউরিয়া প্রক্রিয়াজাত খড় পশু খেলে শরীর বৃদ্ধি দ্রুত হয় এবং পশুর শরীরে মাংশের উৎপাদন বাড়তে থাকে।

ইউরিয়া খাওয়ানোর নিরাপদ পদ্ধতি

বাংলাদেশ সহ সারা পৃথিবী তে নিম্নোক্ত তিনটি সহজ ও নরাপদ ভাবে ইউরিয়া খাওয়ানোর পদ্ধতির প্রচলন রয়েছে।

  1. ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র (ums)
  2. ইউরিয়া মোলাসেস মাল্টি নিউট্রিয়েন্ট/মিনারেল ব্লক (ummb)
  3. সরাসরি খাদ্যের সাথে

ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র (UMS)

ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র বা ইউএমএস এমন একটি প্রযুক্তি যেখানে ইউরিয়া ও চিটাগুড় ব্যবহার করে খড়ের পুষ্টিগুণ বহু গুণ বৃদ্ধি করা হয়। এই পদ্ধতিকে ইউরিয়া ট্রিটমেন্টও বলা হয়। গরু কে ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র (ums) খাওয়ায়ে খুব কম খরচে মোটাতাজাকরণ করা যায়। যেহেতু পরিমিত মাত্রায় নির্দিষ্ট বয়সের গরুকে ইউরিয়া খাওয়াতে হবে সেহেতু ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র (ums) সাবধানতার সাথে তৈরী করতে হবে। কোন ভুল করা চলবে না।

ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র (UMS) তৈরী

ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র (ums) তৈরীর রেশিও হলে- ৮২:১৫:৩ । অর্থাৎ ১০০ কেজি ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র বা ইউ,এম,এস তৈরী করতে ৮২ কেজি শুকনো খড়, ১৫ কেজি মোলাসেস বা চিটাগুড় ও ৩ কেজি ইউরিয়া সার ব্যবহার করতে হবে। প্রথমে খড়, চিটাগুড় ও ইউরিয়া পরিমাণ মতো মেপে নিযতে হবে।

এরপর শুকনো খড়গুলোকে কুচি কুচি করে কাটে নিতে হবে। চিটাগুড় ও ইউরিয়া প্রতি ১০০ কেজির জন্য ৫০ কেজি পানির সাথে মেশাতে হবে। এই দ্রবণ টুকরা করে কাটা খরের সাথে ধীরে ধীরে মেশাতে হবে।

মেশান শেষ হলে পলিথিন বা প্লাস্টিক ড্রামে বায়ুরোধী বা এয়ার টাইট করে ১২ ঘন্টা রেখে দিতে হবে। তৈরীকৃত ইউরিয়া মোলাসেস খড় সঙ্গে সঙ্গে গরুকে খাওয়ানো গেলেও ১২ ঘন্টা পর থেকে খাওয়ারে ভালো হয়। একবারে ২-৩ দিনের তৈরী ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র বা ইউএমএস সংরক্ষণ করে খাওয়ানো যায়। এটি তিন দিনের বেশি সময় সংরক্ষণ ও খাওয়ান যাবে না।

ইউরিয়া মোলাসেস মিনারেল ব্লক (UMMB)

ইউরিয়া মোলাসেস মিনারেল ব্লক (UMMB) হলো উচ্চ প্রোটিন ও ভিটামিন মিনারেল যুক্ত ফিড ব্লক যা গবাদিপশু তথা জাবরকাটা প্রনীদের জন্য চেটে খাওয়ার জন্য দেওয়া হয়। একটি ১০০ কেজি দৈহিক ওজনের গরু কে ৩০০ গ্রাম এই ব্লক প্রতিদিন খাওয়ানো যায়। ৩০০ গ্রাম ইউরিয়া মোলাসেস মিনারেল ব্লক (UMMB) থেকে গরু ৩০ গ্রাম ইউরিয়া বা নাইট্রোজেন পেয়ে থাকে।

ইউরিয়া মোলাসেস মিনারেল ব্লক (UMMB) তৈরী

এই ব্লক খুব সহজেই তৈরী করা যায় এতে তেমন একটা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় না। গমের ভুসি ৩ কেজি, ঝোলাগুড় বা চিটাগুড় ৬ কেজি, ইউরিয়া ৯০ গ্রাম, আয়োডিন যুক্ত লবণ ৩৫ গ্রাম, ৫০০ গ্রাম খাবার চুন, ভিটামিন মিনারেল মিক্সার এবং কাঠ বা লোহার ছাপ।

প্রথমে চিটাগুড়ের সাথে ইউরিয়া, লবন, চুন, সিমেন্ট, ভিটামিন মিনারেল মিক্সার এগুলো ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। এর পর এই মিশ্রণের সাথে গমের ভুসি ও অন্যান্য ইপকরণ মিশিয়ে একটি শক্ত কাঠ বা লোহার ছাচে ফেলে ব্লক তৈরী করা হয়।

এই ব্লক রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। একটি পূর্ণ বয়সের গরুকে প্রতিদিন ৪০-৫০ গ্রাম পর্যন্ত ইউরিয়া খওয়ানো যেতে পার।

সরাসরি ইউরিয়া খাওয়ানোর পদ্ধতি

সরাসরি ইউরিয়া খাওয়ালেও পশুকে মোটাতাজাকরণে সুফল পাওয়া যায়। এই জন্য পশুকে প্রথম ১৫ দিন ১ চা চামচ বা ৫ গ্রাম ইউরিয়া ২০০ গ্রাম চিটাগুড়ের সংগে মিশিয়ে তা ১.৫-২ লিটার পানির সংগে মিশিয়ে টুকরা টুকরা করে কাটা খড়ের সংগে মিশিয়ে খাওয়ানো যায়।

১৫ দিন পর শুধু ইউরিয়ার পরিমাণ ৫ গ্রাম বৃদ্ধি করে মোট ১০ গ্রাম বা ২ চা চামচ একই পরিমাণ চিটাগুড়ের সংগে পরিমাণ মত কাটা খড়ের/ঘাসের সংগে মিশিয়ে এবং পরবর্তী ১৫ দিন পরও আরও ৫ গ্রাম বৃদ্ধি করে অর্থাৎ ১৫ গ্রাম বা ৩ চা চামচ একই নিয়মে খাওয়ানো যায়।

পরবর্তী ১৫ দিন পরও আর ৫ গ্রাম মোট ২০ গ্রাম বা ৪ চা চামচ ইউরিয়া খাওয়াতে হবে। প্রতিদিন ২০ গ্রাম বা ৪ চা চামচের বেশি ইউরিয়া খাওয়ানো যাবে না। এইভাবে সরাসরি ইউরিয়া খাওয়ানোর ৩-৪ মাসের মধ্যে পশুর শরীরের মাংস বেড়ে যাবে।

সরাসরি ইউরিয়া খাওয়ানোর ক্ষেত্রে সাবধানতা

  • এক বছরের নিচের গরুকে ইউরিয়া খাওয়ানো যাবে না। কেননা গরুর রুমেন পরিপূর্ণ সুগঠিত হতে জাত ভেদে ৬ মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগে।
  • অবশ্যই ভালো মানের চিটাগুড় ২০০-২৫০ গ্রাম প্রতিটি গরু প্রতি ব্যবহার করতে হবে। তাছাড়া কম ব্যবহার করা যাবে না।
  • শুকনা খড় ও ঘাসের সংগে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে।
  • সাথে দানাদার খাদ্য যেমন গমের ভুষি, ডাল-জাতীয় ফসলের ভুষি ইত্যাদি সরবরাহ করা যাবে।
  • ইউরিয়া যুক্ত খাদ্য ও দানাদার খাদ্য যেটায় খাওয়ানো হোক খাওয়ার আধাঘন্টা থেকে এক ঘন্টা পর পানি খাওয়ালে গরুর বদ হজমের সমস্যা হয় না। তাই ৩০ মিনিট থেকে এক ঘন্টা পর পানি খেতে দিন।
  • ইউরিয়া বা ইউরিয়া মোলাসেস মিশ্রিত খড় কোনক্রমেই পানির সাথে মিশিয়ে খাওয়ান যাবে না। যতটা সম্ভব শুকনো অবস্থায় ও ধীরেধীরে যাতে খায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • গরুর জাত ও ওজন ভেদে ২০ গ্রাম এর বেশি ইউরিয়া খাওয়ানো যাবে না।
  • প্রথম বার বা হঠাৎ করে ২০ গ্রাম ইউরিয়া খাওয়ানো যাবে না। কারণ, এতে পশুর বদহজম হতে পারে এমনকি বিষ ক্রিয়ায় পশু মারা যেতে পারে। তাই ৫ গ্রাম থেকে শুরু করে আস্তে আস্তে বৃদ্ধি করে সর্বোচ্চ ২০ গ্রাম খাওয়ানো যায়।

ইউরিয়া কেন গবাদিপশুর খাদ্য?

হ্যা প্রীয় খামারি এই প্রশ্ন সকলের মনেই আসতে পারে। ইউরিয়া কেন গবাদিপশুর খাদ্য? তাহলে মানুষ সহ অন্যান্য প্রানীদের কি ইউরিয়া দেওয়া যাবে? ইউরিয়া শুধু যাবর কাটা প্রানিদের জন্য ব্যবহার করা যাবে। তাছারা সকল এনিমেল ও পশু-পাখির জন্য এটি একটি মারাত্বক বিষ।

মানুষ সহ অন্যান্য প্রাণির পাকস্থলির থেকে গরু বা ছাগলের পাকস্থলি ও হজম প্রকৃয়া সম্পূর্ণ আলাদা। যাবর কাটা প্রণিদের পাকস্থলি হয় চার প্রকষ্ঠ বিশিষ্ট।

গবাদিপশু তার খাদ্যের প্রোটিন থেকে নাইট্রোজেন পেয়ে থাকে যা এমোনিয়া যৌগে পরিনিত হওয়ার মাধ্যমে পশুর শরীরে শোষিত হয়। কিন্তু বেশি পরিমানে নাইট্রোজেন খেলে বা বেশি পরিমান এমোনিয়া গ্যাস উৎপন্ন হলে গরুর মারাত্বক টক্সিসিটি তৈরী করে ও মাত্রা বেশি হলে গরু মারা যেতে পারে।

সাবধানতা

গবাদিপশুর জন্য ইউরিয়া সার সম্পূর্ণ নিরাপদ হলেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত ইউরিয়া প্রচন্ড ক্ষতিকর। তাই গবাদিপশুর ওজন অনুযায়ী আপনার সুবিধা অনুযায়ী পদ্ধতিতে গরুকে এটি নিয়মিত খাওয়ানো যেতে পারে। তবে ছয় মাসের কম বয়সী ছাগল ও এক বছরের কম বয়সী গরুকে কোন ভাবেই এগুলো খাওয়ানো যাবে না। কেননা গরুর রুমেন বিকশিত বা পূর্ণতা পেতে এক বছর সময় লাগে। রুমেন সুগঠিত না হওয়া পর্যন্ত এগলো খাওয়ানো তেকে বিরত থাকুন।

রিলেটেড পোস্ট

লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
error: Content is protected !!