হাঁস পালনের ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যা

হাঁস পালনের ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যা। হাঁসের বাসস্থান,  হাঁসের বাচ্চা ব্রুডিং করার নিয়ম। সঠিক নিয়মে হাঁস কিভাবে পালন করতে হবে যানুন। খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও হাঁস চড়ানোর যথাযথ নিয়ম মেনে চলা উচিত।

হাঁস পালনের ব্যবস্থাপনা

হাঁসের বাসস্থান

বাংলাদেশের ছোট খামারিদের জন্য যেকোনো ধরনের গৃহ হাঁসের জন্য উপযোগী। তবে দোচালা ঘর হাঁসের জন্য ভালো। বাস, ছন অথবা খড় দিয়ে ঘর তৈরি করা যেতে পারে। বাসস্থানের মেঝেতে আস্তরণ হিসেবে বালি, ধানের তুষ অথবা খড় বিছিয়ে দিতে হয়। আস্তরণ যখন সেতসেতে অথবা অপরিষ্কার হয়ে যায় তখন তা সরিয়ে নতুন আস্তরণ বিছিয়ে দিতে হয় এবং সেই পুরো আস্তরণ জৈব সার হিসেবে পুকুরে অথবা সবজি বাগানে দেয়া যেতে পারে।

তবে হাঁসের ঘর প্রতিদিন পরিষ্কার করলে রোগের জীবাণু উৎপন্ন হতে পারে না। হাঁসের ঘরে অবশ্যই বিশুদ্ধ বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। ঘরটি এমনভাবে তৈরি করা প্রয়োজন যেমন সেয়াল, বন্য বিড়াল বা বন্য প্রাণী ঘরে ঢুকে হাঁস মারতে না পারে।

হাঁস সাধারণত মেঝেতে ডিম পারে তাই ঘরের দেয়াল বা পাশে ছোট গর্ত করে সেখানে তুষ বা খড় বিছিয়ে দিন এতে ডিমগুলো পরিচ্ছন্ন থাকবে।

তাপ দেয়া বা ব্রুডিং

মুরগির বাচ্চার মতো হাঁসের বাচ্চাকে একই পদ্ধতিতে তাপ দিতে হয়। শীতকালে চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ এবং গ্রীষ্মকালে দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত কৃত্তিম উপায়ে তাপের ব্যবস্থা করতে হয়। তুষের ইত্যাদি দিয়ে তাপের ব্যবস্থা করা যায়। ব্রুডিং এর সময় হাঁসের বাচ্চা খাদ্য, পানি তার নাগালের কাছে রাখা প্রয়োজন।

পানিতে হাঁস ছাড়ার সময়

সাধারণত এক মাস বয়স পর্যন্ত হাঁসের বাচ্চা পানিতে ছাড়া উচিত নয়। এক মাস বয়স পর্যন্ত ঘরে লালন-পালন করে পানিতে ছাড়া অভ্যাস করতে হয়। পানিতে ছাড়ার সময় প্রথম দিনে সারাদিন পানিতে রাখা যাবেনা। যদি সারাদিন পানিতে রাখা হয় তবে হাঁসের বাচ্চা গুলো পানিতে ডুবে মারা যেতে পারে। এজন্য ধীরে ধীরে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে পানিতে চলার অভ্যাস করাতে হবে। গরমকালে তিন সপ্তাহের বয়সের হাস পানিতে ছাড়ার অভ্যাস করা যেতে পারে।

এক মাস হতে দুই মাস বয়সের হাঁসের বাচ্চার যত্ন

যখন হাঁসের বাচ্চার বয়স এক মাস হবে তখন তাদের এমন ধরনের আশ্রয় স্থল এর প্রয়োজন হবে যাতে প্রতিটি বাচ্চার জন্য অন্তত 0.05 বর্গমিটার হতে 0.06 বর্গমিটার পরিমান জায়গা থাকে। এক থেকে দুই মাস বয়স পর্যন্ত প্রতিটি হাঁসের জন্য 0.15 বর্গমিটার জায়গা প্রয়োজন অবশ্যক। আলো-বাতাস প্রবাহের প্রচুর ব্যবস্থা থাকলে 0.91 বর্গমিটার জায়গা হলেও চলবে।

প্রতিদিন ভোরে হাঁসগুলোকে পরিষ্কার পানি ও সামান্য পানি মিশ্রিত হাঁসের সুষম খাদ্য দেওয়া উচিত। খেতে দেওয়ার পর বাচ্চা হাঁসগুলোকে পুকুরে, খালে, হাওড়-বিলে খাদ্য সন্ধান ও সংগ্রহের জন্য নিয়ে যেতে হয়। যেদিন আবহাওয়া দুর্যোগপূর্ণ মনে হবে সেদিন এদেরকে বেশি দূরে নিয়ে যাওয়া উচিত হবে না। কেননা হঠাৎ যদি জোরে বৃষ্টিপাত শুরু হয় এবং এক মাসের বাচ্চারা কোন আশ্রয় স্থল না পায় তবে ঠান্ডা লেগে অনেক হাঁস মারা যেতে পারে। এগুলোই হাঁস পালনের ব্যবস্থাপনা।

চার থেকে পাঁচ মাস বয়সে এরা যেকোন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া অনায়াসে সইতে পারে। দুপুরে হাঁসের বাচ্চা গুলো গাছের ছায়ায় রাখতে হবে। কেননা তখন সূর্যের তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে না। দুপুরে তাপের প্রভাব কমে গেলে এরা আবার খাদ্য সন্ধানে বেরিয়ে পড়তে পারে। সন্ধা হওয়ার পূর্বেই হাঁসের বাচ্চা গুলোকে বাসস্থানে ফিরিয়ে আনতে হবে। আশ্রয়স্থল এর ভিতরে নেওয়ার পূর্বে সামান্য খাদ্য দিলে প্রতিদিন ঘরে ফিরে আসার অভ্যাস গড়ে উঠবে।

ধানক্ষেতে চরানো

ধানের চারা রোপণের এক মাস পর থেকে ধানের ছড়া বা শীষ বের হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ধানক্ষেতে হাঁস চরানো যেতে পারে। এতে ক্ষেতের কীটপতঙ্গ ও ধান গাছের দুই সারির মধ্যে বেড়ে ওঠা আগাছা নিয়ন্ত্রণ এর আর সাহায্য করে। ধানক্ষেতে হাঁসের মলত্যাগে ক্ষেতের উর্বরতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে ধানের ফলন ভালো হয়।

বিল বা হাওরের নিকটবর্তী এলাকায় হাঁস পালনের ব্যবস্থাপনা

হাঁস সাধারনত 4 থেকে 5 মাস বয়সের মধ্যে ডিম দেয়া শুরু করে। ডিম দেয়া হাঁসগুলোকে সকাল নয়টার পর বাসস্থান হতে ছেড়ে দেয়া যেতে পারে। কেননা ওই সময়ের পূর্বেই হাঁসগুলো ডিম পেড়ে থাকে। খুব ভোরে হাঁসগুলোকে বাসস্তান হতে ছেড়ে দিলে এরা মাঠে বা বিল এলাকায় ডিম পাড়তে পারে।

যদি বাসস্থান বা ঘর হতে ছেড়ে দিতে বেশি দেরি করা হয় তবে গরমে অস্থির হয়ে পড়বে। হাঁসের জীবনে সামান্যতম পরিবর্তনও এরা ভীষণ সংবেদনশীল। সকালে বাসস্থান হতে ছাড়া ও বিকালে ঘরে তোলা প্রভৃতি কাজে ঘনঘন সময় পরিবর্তন হলে এরা প্রচুর বিরক্ত হয়। এরকম ব্যতিক্রম হাঁসির ডিম পাড়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

হাঁসকে তাদের নিজের খাদ্য খুঁজে নিতে যথাসম্ভব প্রচুর সময় দেওয়া জরুরি। যখন হাঁসগুলোকে বিল বা হাওর হতে চরিয়ে বাসস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয় তখন সামান্য পরিমাণ খাদ্য ও পানি দিলে ভালো হয়। এটা হাসকে সারাদিন খাদ্য সংগ্রহ ও অন্বেষণের পর তাড়াতাড়ি ফিরতে উৎসাহিত করে। সন্ধ্যার আগে হাঁসকে আশ্রয়স্থলে ঢুকানো উচিত অর্থাৎ অন্ধকার হওয়ার সাথে সাথে আশ্রয়স্থলে ঢুকালে ভালো হয়। যদি অনেক আগে ভাগেই আশ্রয় স্থল ঢুকানো হয় তবে এরা ভীত হয়ে আশ্রয়স্থলে ফেরা পরিহার করতে পারে। হয়তো এমনও হতে পারে তখন তারা হাওড়-বিলে গিয়ে ঘুমাতে পারে।

চর এলাকায় হাঁসের বাসস্থান বা হাঁস পালনের ব্যবস্থাপনা

চর এলাকার ধান কাটার মৌসুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত হাঁসগুলো সেখানে কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। ধান কাটা শেষ হলে এদের মাঠে নিয়ে আসা উচিত। যেখানে এরা সারাদিন ঝরে পড়া ধান খুঁজে খেতে পারে। চর এলাকার জমিতে কখনো কখনো এত ধান থেকে যায় যা থেকে হাস তাদের তিন থেকে চার মাস চলার মতো খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে।

কমপক্ষে দুই থেকে তিন মাস প্রচুর ধান থাকে যা হাঁস খেয়ে কোন সম্পূরক খাদ্য ছাড়াই প্রচুর ডিম দিতে পারে। মাঠের ঝরা ধান যখন ফুরিয়ে আসে তখন থেকে হাঁসকে অল্প অল্প সুষম খাদ্য দেয়া উচিত। এপ্রিল দিকে বৃষ্টিপাত শুরু হলে ছোট ছোট কাটরা গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা শুরু করে এবং যত্রতত্র প্রচুর শামুক-ঝিনুক পাওয়া যায়।

এ ধরনের খাদ্য খেয়ে হাঁস আবার ধান কাটার মৌসুম শুরু হওয়া পর্যন্ত কোন সম্পূরক খাদ্য ছাড়াই প্রচুর হাঁসের ডিম দিতে পারে। একজন পরিশ্রমি চাষী বাংলাদেশের চর এলাকায় খাদ্য ক্রয় না করে 200 থেকে 400 টি পর্যন্ত একটি হাঁসের ঝাক পালন করতে পারে।

আরো পড়ুন- ডাক ফিড, হাঁসের ডাক প্লেগ রোগ

Leave a Comment

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!