গবাদি পশুর ম্যাস্টাইটিস বা ওলান পাকা রোগ (Mastitis in cows)

গবাদি পশুর ম্যাস্টাইটিস বা ওলান পাকা রোগ দুগ্ধবতী গাভী ও ছাগীর একটি মারাত্বক রোগ। গাভী গরুর ম্যাস্টাইটিস বা ওলান পাকা রোগের ফলে খামারে দুধ উৎপাদনের পরিমান ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওলানে প্রদাহ জনিত কারনে গাভীর ধরাবাহিক দুধ উৎপাদন কমে আসে এবং শারীরিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি হতে দেখা যায়। গবাদি পশুর ম্যাস্টাইটিস (mastitis in cows) বিভিন্ন প্রকার হয়।

গবাদি পশুর ম্যাস্টাইটিস বা ওলান পাকা রোগ

ম্যাস্টাইটিস বা ওলান পাকা রোগের বিভিন্ন ধাপ

  • ক্লিনিকাল ম্যাস্টাইটিস
  • সাব ক্লিনিকাল ম্যাস্টাইটিস
  • অ্যাকিউট ম্যাস্টাইটিস
  • সাব অ্যাকিউট ম্যাস্টাইটিস
  • ক্রনিক ম্যাস্টাইটিস

সাবক্লিনিকাল মাস্টাইটিস

সর্বাধিকভাবে স্ট্যাফিলোকক্কাস অরিয়াস, স্ট্র্যাপের সাথে সম্পর্কিত। দুধ উৎপাদন স্বাভাবিক প্রদর্শিত হয় এবং স্তন্যপায়ীপশুর ওলান প্রদাহের কোনও চিহ্ন থাকে না। তবে দুধের উৎপাদন কমে যায়। দুধে সোম্যাটিক কোষের সংখ্যা বৃদ্ধির ভিত্তিতে সাবক্লিনিকাল মাস্টাইটিস নির্ণয় করা হয়।

ক্লিনিকাল মাস্টাইটিস

রোগের লক্ষণ জীবাণুগুলির ধরণের উপর নির্ভর করে, জ্বর এবং অবসাদ এই রোগের সাথে যুক্ত হতে পারে। ওলানের গ্রন্থির প্রদাহের প্রমাণ পাওয়া যায় ( যেমন- লালভাব, তাপ, ফোলাভাব, ব্যথা ইত্যাদি)। দুধে রং পরিবর্তন হয় (কয়েকটি দুধের ক্লট থেকে ফাইব্রিনের ক্লাম্প সহ সিরামের মতো উপস্থিত হওয়া)।

অ্যাকিউট ম্যাস্টাইটিস

অ্যাকিউট ম্যাস্টাইটিস এর সাথে জড়িত অনুজীবগুলি হলো কলিফর্ম অর্গানিজ সহ ই কোলি এবং ক্লেবিসিলা এবং স্টাফাইলোকক্কাসের প্রজাতিগুলি এবং এন্টারোকোকি। কোলিফর্ম অনুজীবের সাথে সবচেয়ে বেশি যুক্ত যেমন ই কোলি এবং ক্লেবিসিল্লা এবং স্টাফাইলোকক্কাসের প্রজাতিগুলির সাথে। ক্লিনিকাল লক্ষণগুলি হলো গুরুতর জ্বর, অবসাদ, ক্ষুধা হ্রাস) গাভীর ওলান ফুলে যায়, শক্ত এবং বেদনাদায়ক হয়। দুধের মধ্যে ক্লট বা ফ্লেক্স থাকতে পারে এবং তা জল, সিরাস বা পিউরেন্ট হতে পারে।

অ্যাকিউট গ্যাংগ্রেনাস ম্যাসাটাইটিস

সাধারণত S. aureus, Cl. Perfringens, and E. coli. অনুজীব সংক্রমন হয়ে থাকে। অ্যানোরেক্সিয়া, ডিহাইড্রেশন, অবশাদ, জ্বর এবং টক্সেমেমিয়ার লক্ষণগুলি প্রকাশ পায় এবং কখনও কখনও মৃত্যুর দিকে পরিচালিত করে। রোগের প্রথম দিকে, ওলান লাল, ফোলা এবং উষ্ণ হয়। কয়েক ঘন্টার মধ্যে গাভীর বাঁট শীতল হয়ে যায়। দুধের সাথে পানি এবং রক্ত দেখা যায়।

ক্রনিক ম্যাস্টাইটিস

সাধারণত coagulase-negative staphylococci, S. aureus, and S. uberis. অনুজীব সংক্রমন হয়ে থাকে। এটি সবচেয়ে জটিল অবস্থা। এসময় দুধে সোমাটিক সেলের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

রোগের কারণ

গাভীর ওলান প্রদাহ বিভিন্ন প্রকার অনুজীব থেকে হয়ে থাকে। ম্যাসাটাইটিস সৃষ্টিকারী প্যাথোজেনগুলির মধ্যে ব্যাকটেরিয়া (বেশিরভাগ স্ট্যাফিলোকক্কাস অরিয়াস, কোগুলাস-নেগেটিভ স্টেফিলোকক্কাস, স্ট্রেপ্টোকোকাস উবারিস, স্ট্রেপ্টোকোকাস ডাইস্ল্যাকটিয়, স্ট্রেপ্টোকোকাস আগাল্যাকটিয়, এন্টেরোকোকি এবং এশিরিচিয়া কলি সহ কলিফর্ম ব্যাকটিরিয়া) উল্লেখ যোগ্য। সংক্রমণের উৎসের ভিত্তিতে ম্যাসাটাইটিস রোগকে দুটি বিভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে।

  1. দুধের প্রক্রিয়া চলাকালীন অন্য গরু থেকে গাভীতে সংক্রামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ দ্বারা মস্টাইটিস সংক্রমণ।
  2. পরিবেশের ব্যাকটেরিয়া থেকে প্রাপ্ত পরিবেশগত সংক্রমণ।

রোগের লক্ষণ

  • গাভীর ওলান লাল হয়ে ফুলে ওঠে এবং ওলানে হাত দিলে গরম অনুভুত হয়।
  • গাভীর ওলানে প্রচুর ব্যাথা থাকে ফলে হাত দিতে দেয় না।
  • গাভীর পেছনের পা দুটি ফাঁক করে দ্বাড়িয়ে থাকে শুতে পারে না।
  • আক্রান্ত গবাদিপশুর শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায় (১০৪-১০৭ ডিগ্রি ফা.)।
  • গাভীর বাট শক্ত হয়ে যায় ফলে সহজে দুধ বের হয় না।
  • গরুর দুধের রং হলুদ ও পুঁজের মত দেখায়। পরবর্তিতে দুর্গন্ধযুক্ত ও রক্ত মিশ্রিত দুধ বের হয়।
  • আক্রান্ত বাঁট বন্ধ হয়ে যায় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে পঁচন ধরে।
  • মারাত্বক অবস্থায় পৌছালে গাভীর মৃত্যু ঘটে।

করণীয়

  • ওলান সবসময় জীবাণুমুক্ত করা, দুধ দোহনের আগে ও পরে ভায়োডিন/টিংচার অব আয়োডিন ডিপিং করা।
  • গরম পানি ও জীবানুমুক্ত নরম টাওয়েল দিয়ে ওলান পরিস্কার করুন প্রতিদিন দুধ দোহনের আগে ও পরে।
  • গাভীর দুধ দোহন কারীর হাত ক্ষারীয় সাবান যেমন- হেক্সাসল, ইথানল জাতীয় জীবানুনাশক ঔশধ দিয়ে পরিস্কার করে ওলানে হাত দিতে হবে। কারণ দুধ দোহনকারীর হাত থেকে ম্যাস্টাইটিস অসুস্থ গরু থেকে সুস্থ্য গরুতে চলে যেত পারে।
  • দুধ দোহনের সময় সুস্থ্য গরুকে আগে দহন করতে হবে। ম্যাস্টাইটিস আক্রান্ত সন্দেহ গরুকে চিহ্নিত করে আলাদা করতে হবে সেইসাথে সর্বশেষে দুধ দহন করা যেতে পারে।
  • অনেক সময় বাছুর দিয়ে দুধ খাওয়ালে বাছুরের দাঁতের কামড় থেকে এসব সমস্যা হয়।
  • ওলান শক্ত হয়ে গেলে কর্পূর ও সরিষার তৈল দিয়ে দিনে দুইবার বাটে মেসেজ করলে উপকার পাওয়া যায়।
  • ঘরের ফ্লোর চুন, পটাশ, সোডা, ব্লিচিং দিয়ে পর্যাক্রমে জীবানুমুক্ত করুণ।
  • ওলানে রাতে খাবার চুন, হলুদ, এলোভেরার জেল ও নিমপাতা পেস্ট লাগিয়ে রাখা যেতে পারে।
  • খামার মশামাছি মুক্ত রাখতে হবে, ওলানে যাতে মাছি না বসে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • গাভীর বাটে অন্য কোন ইনফেকশন থাকলে ডাক্তারের পরামর্শে ঔষধ ব্যবহার করতে হবে। এখেত্রে নেবানল ক্রীম ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • দুধ দহনের পর গাভীকে খাবার দিয়ে 40 মিনিট দাঁড়িয়ে রাখতে চেষ্টা করতে হবে। এতে ওলানের বাটের ছিদ্রপথ বন্ধ হবে এবং জীবানু ডুকতে পারবে না।
  • গাভীর পায়ের নিচে রাবারের ম্যাট ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রতিটি গাভীর জন্য ২ করে ম্যাট বরাদ্দ রাখতে হবে এবং শুকিয়ে এক দিন পরপর ব্যবহার করলে অধিকতর ম্যাস্টাইটিস প্রবনতা থেকে রক্ষা পাওয়া সহজ।
  • নো-ম্যাস্টি/ম্যাস্টিকেয়ার, সজিনা পাতা, এভেইলা4, ক্যালসিয়াম+ফসফরাস পাউডার বা সিরাপ ব্যবহার এ ক্ষেত্রে কার্যকর।

প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

  • দুধ দোহনের আগে ও পরে দোহনকারীর হাত ও গাভীর বাট বাঁটকে জীবাণুনাশক পভিডন ভেট সলুসনে ডুবিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
  • দুগ্ধবতী গাভীকে সবসময় পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন ও শুষ্ক স্থানে রাখতে হবে।
  • দুধ দোহনের পর গরুকে খাবার দিতে হবে যাতে দাড়িয়ে থাকে।
  • আক্রান্ত ওলান বা বাঁট গরম ও ফোলা থাকলে ও ব্যাথাযুক্ত হলে প্রথমে বরফ অথবা ঠান্ডা পানি আক্রান্ত ওলানে ঢালতে হবে। ওলানে দুধ জমে গেলে মিল্ক সােইফন নামক যন্ত্র দিয়ে তা বের করে দিতে হবে।
  • সাব-ক্লিনিকাল সমস্যায় ম্যাস্টি ২৪/ ম্যাস্টি কেয়ার ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • এন্টিবায়টিক যেমন- ট্রাইজেক্ট ভেট ইনজেকশন, ব্যাথানাশক ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে।
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!