জৈব কীটনাশক/বালাইনাশক তৈরি ও ব্যবহার

জৈব কীটনাশক বা বালাইনাশক বলতে রাসায়নিক উপাদান ব্যতিরেখে জৈব উৎস বিশেষ করে উদ্ভিদ বা উদ্ভিদাংশ থেকে উৎপন্ন বালাইনাশককে বুঝায়। আমাদের দেশ ভেষজ উদ্ভিদ বৈচিত্র্যে খুবই সমৃদ্ধ। অতি প্রাচীন কাল থেকেই মানুষের স্বাস্থ্য সেবায় ও ফসলের পোকা-মাকড় দমনে বিভিন্ন গাছ ও অংশ বিশেষ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে এমন বালাই ব্যবস্থাপনাকে জৈব বালাইনাশক বা জৈব কীটনাশক বলা হয়। কৃষিতে জৈব বালাইনাশকের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

জৈব কীটনাশক বা বালাইনাশক তৈরি ও ব্যবহার

জৈব কীটনাশক ব্যবহারের গুরুত্ব

আমাদের ক্রমবর্ধমান জনসংখার চাহিদা মেটাতে আমাদের অধীক উৎপদনের দিকে নজর দিতে হচ্ছে। প্রচুর রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার হচ্ছে যা আমাদের জীব বৈচিত্রে ব্যপক প্রভাব ফেলছে। এতে পরিবেশের মারাত্বক খতি সাধিত হচেছ। আমাদের এই বিপদজনক বালাইনাশক ব্যবহার থেবে ফিরে জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার বাড়াতে কৃষি মন্ত্রনালয় কাজ করছে।

জৈব বালাইনাশক ব্যবহারে সুবিধা

  • উদ্ভিজ্জ বালাইনাশক পরিবেশের কোন ক্ষতি করে না।
  • জৈব বালাইনাশকের প্রভাবে ক্ষতিকর পোকার বৃদ্ধি ব্যহত হলেও উপকারী পোকামাকড়ের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই;
  • মাটির অণুজীব ও কেঁচোর উপর কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই;
  • মাছ, পাখি ও গবাদি পশুর উপর কোন বিষক্রিয়া নেই;
  • জমিতে স্প্রে করার সাথে সাথে ফসল তোলা ও ব্যবহার করা যায়;
  • জৈব বালাইনাশকের কোন দীর্ঘ মেয়াদী অবশিষ্টাংশ বিদ্যমান থাকেনা বলে পরিবেশের জন্য নিরাপদ।

জৈব কীটনাশকরূপে ব্যবহার যোগ্য উদ্ভিদ ও এর অংশ

  1. নিম গাছ- পাতা, কান্ড, ফুল ও বীজ।
  2. তামাক- পাতা।
  3. পেঁপে গাছ- পাতা।
  4. ধুতরা- পাতা, কান্ড, ফুল ও বীজ।
  5. তুলসী- পাতা, ডাল ও ফুল।
  6. মেক্সিকান গাঁদা- শিকড়, পাতা, ডাল ও ফুল।
  7. মেহগনী- বীজ।
  8. ভেন্না- বীজ।

জৈব কীটনাশক ঘরে তৈরির পদ্ধতি

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার আসরাফুলের গল্প আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। উপজেলা সদর থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে মল্লিকপুর গ্রামর শিক্ষিত কৃষক আশরাফুল ও তার স্ত্রী যূথী কার্যকরী জৈব বালাইনাশক তৈরি, ব্যবহার করে সারা ফেলে দিয়েছে। তারা কয়েক ধরনের জৈব বালাইনাশক, ফসলের ভিটামিন ও জৈব সার আবিষ্কার করেছেন। এগুলো ফসলে ব্যবহার করে অধিক ফলন পাওয়া গেছে। গ্রামের কৃষকরাও তাঁদের উদ্ভাবিত পরিবেশবান্ধব বালাইনাশক সার ব্যবহার করে লাভবান হচ্ছে।

জৈব কীটনাশক বা বালাইনাশক

সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমে আসরাফুলকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। আসরাফুল ৫০ গ্রাম কেরোসিন, ২০০ গ্রাম তামাক পাতা, ১০০ গ্রাম হুইল পাউডার ও গরুর চোনা দিয়ে যে জৈব কীটনাশকও উদ্ভাবন করেছেন তা পটোল, বেগুন, শিমে স্প্রে করলে সব ধরনের পোকা দমন হবে।

এ ছাড়া তিনি জাপ পোকা দমনের জন্য ২০ কেজি পানি, ২০০ গ্রাম তামাকপাতা, গরুর চোনা, ৫০০ গ্রাম কাঁচা পেঁয়াজ দিয়ে বালাইনাশক তৈরি করে ফল পেয়েছেন।

আশরাফুলের স্ত্রী জুথী ২০টি মেহগনি ফল, এক কেজি নিমপাতা, এক কেজি নিমছাল, এক কেজি ভাটির পাতা, ২০০ গ্রাম তামাক ও ২০ কেজি গরুর চোনা দিয়ে যে বালাইনাশক তৈরি করেছে তা জুথী জৈব বালাইনাশক নামে ব্যপক পরিচিতি পেয়েছে। যা মাজরা পোকা দমনে খুবই কার্যকর।

নিম পাতা দিয়ে জৈব কীটনাশক তৈরি

প্রথেম ২০০ গ্রাম নিম পাতা ১ লিটার পানিতে যে কোন পাত্রে ১২ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে শুধু মাত্র পাতা তুলে নিয়ে ভালোভাবে বেটে নিতে হবে। তারপর ঐ ১ লিটার পানিতে বাটা নিমপাতা ভালো করে মিশিয়ে নিয়ে ৫ গ্রাম ডিটারজেন্ট পউডার মেশাতে হবে। উক্ত জৈব কীটনাশকটি যে কোন পোকা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনে দারুন কার্যকারী।

শেষ কথা

আশাকরি আসরাফুলের জীবনের গল্প থেকে আপনার এই জৈব কীটনাশক তৈরির পদ্ধতি বুঝতে পেরেছেন। এগুলো সবই জৈব বা প্রাকৃতিক উপাদান। পরিমানে কম বা বেশি হলে হয়তো আপনার পোকা দমন হবেনা তবে গাছের উপর কোন বিরুপ প্রভাব পরবে না। এটা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও পরিবেশ বান্ধব। আর তাই আপনি অনায়াসে এটি ট্রায় করতে পারেন আপনার ফসলে, বাগানে ও বিভিন্ন গাছে।

আরো পড়ুন- ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরি

Leave a Comment

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!