গাভী হিটে না আসার কারণ ও হিটে আনার উপায়

গাভী হিটে না আসার কারণ ও হিটে আনার উপায় শীর্ষক আজকের আলোচনায় আপনাকে স্বাগতম। গাভী হিটে না আসার কারণ গুলো সম্পর্কে সঠিক ধারনা থাকলে আমরা এই সহজেই এই সমস্যা থেকে পরিত্রান পেতে পারি। গাভী হিটে আনার উপায় গুলো নিয়েও আজকে আলোচনা করবো। এটি গাভী গরুর প্রজনন তন্ত্রের রোগ।

গাভী/বকনা হিটে আসার সময় প্রথমে যানতে হবে। একটি বকনা গরু সাধারনত ১৭-২৪ মাস অর্থাৎ ২ বছর বয়সে প্রথমবার হিটে আসে। গাভী গরু বাছুর প্রসবের ৪-৮ সপ্তাহের মধ্যেই হিটে আসে। গাভীর প্রথমবার বাছুর প্রসবের পর এসময় কিছুটা বৃদ্ধি পেতে পারে। গাভী যদি ৯০-১০০ দিনের মধ্যে আর বকনা যদি ২৪ মাসের মধ্যে হিটে না আসে তাহলে বুঝতে হবে গরুর প্রজনন স্বাস্থ্যে কোন সমস্যা হয়েছে।

গাভী হিটে না আসার কারণ

গাভী হিটে না আসার কারণ

গাভী হিটে না আসার কারণ অনেকগুলো বিষয়ের সাথে যুক্ত। সামগ্রিকভাবে নিম্নোক্ত তিনটি বিষয় যুক্ত থাকে। যথাঃ

  1. গাভী হিটে না আসার নিউট্রেশন সংক্রান্ত কারণ
  2. গাভী হিটে না আসার রোগ ব্যাধি সংক্রান্ত কারণ
  3. গাভী হিটে না আসার পরিবেশ সংক্রান্ত কারণ

গাভী হিটে না আসার নিউট্রেশন সংক্রান্ত কারণ

গাভী হিটে না আসার কারণ গুলোর মধ্যে অন্যতম বা প্রধন কারণ এটি। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে গাভী হিটে না আসা এবং বীজ না রাখার জন্য যত গুলো কারণ রয়েছে এর মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগই হল নিউট্রেশনাল বা পুষ্টির অভাব জনিত কারণে।

আমরা খাবারের গুনগত মান পরিক্ষা করিনা বা খাবারের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সঠিক ধারনাও নেই। এবং আমরা আমাদের ইচ্ছা মাফিক খাবার প্রদান করি।

আমরা একবারও চিন্তা করিনা যে গাভীর জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির যোগান হচ্ছে কিনা। গাভী বা বকনার শরীরে নিম্নোক্ত নিউট্রিয়েন্ট বা পুষ্টির অভাব এবং কখনো কখনো আধিক্য থাকলে গাভী হিটে আসবে না বা বীজ রাখবে না।

  • ক্যালসিয়াম
  • ফসফরাস
  • সেলিনিয়াম
  • আইরন
  • ভিটামিন এডি৩ই
  • ভিটামিন ডি৩
  • প্রোটিন
  • এনার্জি

রোগ ব্যাধি সংক্রান্ত কারণ

গাভী হিটে না আসার কারণ গুলোর মধ্যে এটি একটি অন্যতম কারণ। কেননা আমাদের দেশের অধীকাংশ গাভী প্রজনন স্বাস্থ্য সহ নানা প্রকার স্বাস্থ জটিলতায় ভোগে। গাভী অধিকাংশ সময় রোগে আক্রান্ত থাকলে সে গাভী হিটে আসে না। কৃমি জনিত রোগ, ককসিডিওসিস বা আমাশয়, প্রোজনন অংগে ইনফেকশন ইত্যাদি রোগ অন্যতম।

কুত্রিম প্রজনন কর্মীর দক্ষতার অভাব থাকলে এবং তাকে দিয়ে কৃত্রিম প্রজনন করালে গরুর নানা প্রকার প্রজনন স্বাস্থের অসুস্থতা সৃষ্টি হয়। খাদ্যে পর্যাপ্ত ভিটামিন ও মিনারেলের অভাব থাকলে প্রজনন ক্ষমতা কমে যায়।

গাভী হিটে না আসার কারণ গলো সম্পর্কে আমাদের ভালো ধারনা থাকতে হবে। কৃমিতে অধীক পরিমানে আক্রান্ত হলে গরু হিটে আসে না বা আসলেও কনসেপ্ট করে না। আর তাই প্রজনন ক্ষম গরুকে কৃমি মুক্ত করুন আর কিছু ভিটামিন মিনারেল খায়িয়ে দিন দেখবেন গরুর তেমন বোন সমস্যা না থকলে ঠিক হিটে এসে যাবে।

পরিবেশ সংক্রান্ত কারণ

গাভী হিটে না আসার কারণ গুলোর মধ্যে এটি একটি কারণ। গাভীর দুধের উৎপাদন ও প্রজনন দুটোতেই পরিবেশের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রয়েছে। আলো-বাতাস কম পেলে গাভী হিটে আসেনা। একই ঘরে গাভী ও ষাঁড় পালন করলেও এই সমস্যা হয় গাভী গরুর আবাসস্থল আলো-বাতাসপূর্ণ ও আরামদায়ক হতে হবে। গাভীর হাটাচলার ব্যবস্থা থাকতে হবে। খামারের আশেপাশের পরিবেশ জীবাণুমুক্ত ও নির্মল হতে হবে।

গাভী হিটে আনার উপায়

গাভী হিটে আনতে প্রথমে দেখতে হবে পুষ্টিগত সমস্যা আছে কিনা। এরপর রোগ, বীজ ও পরিবেশগত বিষয় সমূহ বিবেচনা করতে হবে। গাভী গরু যদি ৮-৯ সপ্তাহেও হিটে না আসে বা গর্ভধারণ না করে তাহলে নিম্নোক্ত ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।

প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট

উচ্চ প্রোটিন যুক্ত খাবার যেমন ফিস মিল, সয়াবিন মিল, সরিষার খৈল, নারিকেলের খৈল, তিলের খৈল, সূর্যমুখী খৈল অথবা বাজারে প্রাপ্ত প্রোটিন সাপলিমেন্ট খাবারে দিতে হবে।

অতিরিক্ত সরিষার খৈল দেওয়া যাবে না এতে ইরোসিক এসিড থাকে। গরুর জন্য একটি ভালো প্রোটিনের উৎস্য হলো সযাবিন মিল বা সয়ামিল।

সয়াবিন মিলে সুষম মাত্রায় এমায়নো এসিড পাওয়া যায়।

মেটাবলিক এনার্জি

আঁশ যুক্ত খাবার কমিয়ে উচ্চ এনার্জি যুক্ত খাদ্য সরবরাহ করতে হবে যাতে খাদ্যের মেটাবলিক এনার্জি বৃদ্ধি পায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আঁশের পরিমাণ ১০% এ নামিয়ে আনতে হয়।

ক্যালসিযাম ও ফসফরাস

গাভীর শরীরের ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস এর অভাব পুরন করতে হবে। ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস এর একটি ভালো উৎস হলো ডিসিপি (ডাইক্যালসিয়াম ফসফেট) বা DCP। এছড়াও ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও ভিটামিম ডি৩ এর একটি ওরাল সাসপেনশন পাওয়া যায়। বাজারে যে সকল লিকুইড ক্যালসিয়াম পাওয়া যায় সেগুলোর যে কোন একটি ব্যবহার করা যেতে পাড়ে।

ভিটামিন এডিই

ভিটামিন এ, ডি৩ ও ই এই তিনটি ভিটামিন একত্রে পাওডার, ওরাল সলুশন ও ইনজেকশন এই তিন ফর্মে বাজারে পাওয়া যায়। তবে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করলে দ্রুত ফলাফল পাওয়া যায়।

সেলেনিয়াম

গাভী বা বকনার প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য অতি দরকারি একটি মিনারেলের নাম সেলিনিয়াম। বাজারে ভিটামিন-ই + সেলিনিয়াম একসাথে একটি ওরাল সিরাপ পাওয়া যায়। এটি খাওয়াতে হবে। যেমন- ইসেল (স্কয়ার) খাওয়ানো যেতে পাড়ে।

অভিজ্ঞ ডাক্তার

এরপরও গাভী বা বকনা হিটে না আসলে একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার দ্বারা গাভী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে দেখতে হবে। গাভীর জরায়ুতে কোন প্রকার সমস্যা আছে কিনা, কোন প্রকার ভাইরাস বা ব্যকট্যারিয়া দ্বারা আক্রান্ত কিনা এবং জরায়ুতে চর্বি জমেছে কিনা এবং জরায়ু সঠিক স্থানে আছে কিনা।

প্রতিরোধের উপাই

সমস্যা তৈরি হওয়ার আগে থেকেই আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে। গাভী বা বকনার দেহে যেনো কোনো ভিটামিন ও মিনারেলের অভাব না থাকে সেদিকে নজর রাখতে হবে।

গাভীর দেহে যেন প্রোটিন ও এনার্জি (শক্তি) এর অভাব না থাকে সেদিকে নজর রাখতে হবে। খামারে যথেষ্ট আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। গাভীকে রোগমুক্ত ও সম্পূর্ণ সুস্থ রাখতে হবে।

সর্বপরি গাভীকে পর্যাপ্ত কাঁচা ঘাস ও সঠিক মাত্রায় ভিটামিন, মিনারেল, এমাইনো এসিড, প্রোটিন ও মেটাবলিক এনার্জি সমৃদ্ধ দানাদার খাদ্য সরবরাহ করতে হবে।

গরু হিটে আনার ঔষধ

গরু হিটে না আসলে সকল খাসারিরই মাথাব্যথা তৈরি হয়। কেননা গরু সঠিক সময়ে হিটে না আসলে খামারে লোকসান হবে। গরু শুধু খাবে কোন উৎপাদন আসবে না। আর তাই গরুকে চিকিৎসা করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় একজন ভেটেরিনারী ডাক্তার কে দিয়ে গরুটি পর্যবেক্ষণ করিয়ে তার কাছে থেকে চিকিৎসা পত্র গ্রহণ করা। আমরা এখানে গরু হিটে আনার ঔষধ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেবার চেস্টা করবো। গরু হিটে আনতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ ও ঔষধ গ্রহণ করা যেতে পারে-

গাভী বা বকনা গরু হিটে আনার পদক্ষেপ

  • প্রথমে গরুকে সম্পূর্ণ রুপে সকল পরজীবী মুক্ত করতে হবে।
  • গরুর খাদ্য ব্যাবস্থপনা উন্নত করবে হবে।
  • খাদ্যে পর্যাপ্ত প্রোটিন সরবরাহ করতে হবে।
  • গাভী বা বকনা কে অন্য এঁড়ে বা ষাঁড় গরু থেকে আলাদা রাখতে হবে।

গাভী বা বকনা গরু হিটে আনার ঔষধ

  • ভিটামিন-এ, ভিটামিন-ডি৩ ও ভিটামিন-ই এই কম্পোজিশনের ইনজেকশন ও ‍সিরাপ পাওয়া যায় এটি প্রয়োগ করতে হবে।
  • ভিটামিন-ই পাওডার পাওয়া যায় এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • ভিটামিন-ই এবং সেলিনিয়াম এর কম্বিরনশন এক প্রকার ওরাল সলুসন পাওয়া যায় এটি অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। কেননা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় সেলিনিয়ামের ঘাটতি থাকে।
  • এছাড়াও যেকোন মাল্টি ভিটামিন ও মাল্টি মিনারেল ব্যবহার করা যেতে পারে।

লাভ জনক ডেইরী খামারি হতে হলে গাভী হিটে না আসার কারণ ও হিটে আনার উপায় গলো সম্টর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে। এরং সঠিক সময়ে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আরো পড়ুন-

গাভী হিটে না আসার কারণ গলো সম্পর্কে আমাদের ভালো ধারনা থাকতে হবে। কৃমিতে অধীক পরিমানে আক্রান্ত হলে গরু হিটে আসে না বা আসলেও কনসেপ্ট করে না। আর তাই প্রজনন ক্ষম গরুকে কৃমি মুক্ত করুন আর কিছু ভিটামিন মিনারেল খায়িয়ে দিন দেখবেন গরুর তেমন বোন সমস্যা না থকলে ঠিক হিটে এসে যাবে।

লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।

2 thoughts on “গাভী হিটে না আসার কারণ ও হিটে আনার উপায়”

  1. HF বকনা ৩০ দিন পরপর হিটে আসে। ১০ বাড়ের উপরে AI করা হয়েছে। মিউকাস স্বচ্ছ এবং মিউকাস কম। HF বকনার ওজন ৩৫০+ কেজি।
    আপনার কাছে পরামর্শ প্রার্থনা করছি।

  2. Md. Shaiful Islam

    প্রজননক্ষম বকনাকে অন্যান্ন এঁড়ে গরু থেকে আলাদা রাখবেন। যদি সবসময় আলাদায় থাকে তাহলে আপনার জন্য পরামর্শ হলো পাবনা ও শিরাজগন্জ এলাকার মিল্কভিটার একজন রেজিঃ ডাক্তারের পরমর্শ গ্রহণ করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!