গরু মোটাতাজাকরণ খামার তৈরির পূর্বকথা

গরু মোটাতাজাকরণ খামার তৈরির পূর্বকথা নিয়ে আজকের এই আলোচনায় সকলকে স্বাগতম। প্রিয় খামারি ভাই, আমরা সকলেই জানি যে বাংরাদেশে গরু মোটাতাজাকরণ খামার এ গরু কে আবদ্ধ অবস্থায় পালন করতে হয়। আর তাই এদের বাসস্থান উত্তম ও সঠিক হওয়া আবশ্যক।

গরুর বাসস্থান গরুর জন্য আরামদায়ক হতে হবে। গবাদিপশুর উৎপাদন ক্ষমতার উপর তার বাসস্থান ও প্রোকৃতির একটি বড় প্রভাব রয়েছে। গরু মোটাতাজাকরণ খামার এ নির্বাচিত প্রাণীর বাসস্থান তথা শেট যতটা আরামদায়ক হবে ঠিক ততটায় গরু সুস্থ ও উৎপাদনশীল হবে।

আর তাই বানিজ্যক ভাবে গরু মোটাতাজাকরণ এর ক্ষেত্রে শেটে সকল দরকারী সুবিধার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

গরু মোটাতাজাকরণ খামারের শেট নির্মাণ

গরু মোটাতাজাকরণ খামার

একটি আধুনিক গরু মোটাতাজাকরণ খামারে নুন্যতম তিন ধরনের শেট বা ঘর আলাদা-আলাদা থাকা দরকার।

  1. অসুস্থ বা নতুন কেনা গরুর পর্যবেক্ষনের জন্য শেট,
  2. গরুর খাদ্য ও সরঞ্জামাদি সংরক্ষণ, অফিস ও শ্রমিকদের আবাসন শেট,
  3. মোটাতাজা করনে উপযুক্ত গরুর মুল বসস্থান।

কখনো কখনো আরো বেশি শেট বা ঘরের প্রয়োজন হয়। যেমন গরুর গোবর থেকে ভার্মিক কম্পোস্ট সার তৈরির জন শেট নির্মানের প্রয়োজন হয়।

গরু মোটাতাজাকরণ খামারের শেট

গরু মোটাতাজাকরণ খামারের জন্য তার আবাসস্থল তথা ঘর নির্মানে সতর্ক থাকতে হবে। সারা পৃথিবী তে গগরু মোটাতাজাকরণ খামার ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত দুই ধরনের শেট সবচেয়ে জনপ্রিয়। যথা-

  • উন্মুক্ত শেট
  • প্রচলিত শেট

উন্মুক্ত শেট

এ ধরনের গরু মোটাতাজাকরণ খামার সেডে গরু সেডের ভিতরে ছারা অবস্থায় থাকে এবং অনেকগুলো একই বয়সি গরু একসাথে স্বাধীন চলাচল করতে পারে। সেডের চাল বা ছাওনি প্রশস্থ ও উঁচু হয় এবং চারদিক শক্ত কাঠ বা লোহার পাইপের বিশেষ ধরনের ব্যরা বা ঘেরা দেওয়া হয়। সেডের সাথে এক খন্ড চারণচারণভূমি যুক্ত থাকে যেখানে গরু হাটাচলা ও বিশ্রাম করতে পারে। খাদ্য প্রদানের জন্য চাড়ি বা পাত্র ব্যবহার করা হয় না।

সেডের ব্যাড়া ঘেশে বারান্দার ফ্লোরে খাবার ঢেলে দেওয়া হয় এবং গরু সেগুলো লোহার পাইপের গ্রিল বা ব্যাড়ার নির্দিষ্ট ফাঁক দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে খেতে পারে। সেডের ভেতরে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ রাখা হয়।

এ ধরনের সেডের অনেক উপকারী দিক থাকলেও গরু মোটাতাজাকরণের জন্য কিছুটা সমস্যার। আর তাই আমাদের দেশে এ ধরনের সেড জনপ্রিয়তা পায়নি।

প্রচলিত শেট

এই ধরনের গরু মোটাতাজাকরণ খামার সেডে গরু বাঁধা অবস্থায় পালন করা হয় যা ১ বা ২ বা গোলাকার সারিতে অবস্থান করে। প্রতি মোটাতাজাকরণ গরুর জন্য স্বতন্ত্র থাকার ব্যবস্থা সেডের মধ্যে কাঠ অথবা লোহার রড দ্বারা পৃথক করা থাকে। গরুর সম্মুখে লম্বা ম্যানজার বা খাদ্যপাত্র স্থাপন করা হয়।

খাদ্য পাত্রের পাশে আলাদা পানির পাত্র অথবা অটো ওয়াটার ড্রিংকারের ব্যবস্থা থাকে। খাবারের পাত্র ও মেঝে ইট বালি ও সিমেন্ট দিয়ে প্রস্ত্তত করা হয়।

একটি আধুনিক মোটাতাজাকরণ শেটে গরুর জন্য স্বাস্থ্য সন্মত ও আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে আধুনিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকাটা জরুরি। আধুনিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা শুধু গরুর সুস্বাস্থ্য ও অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করে না এখান থেকে জৈব সার ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে খামার কে অধিক লাভজনক করা যায়।

গরুর খাদ্য পাত্রের শ্রেনিবিন্যাসের উপর ভিত্তি করে প্রচলিত শেট কে চার ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

  1. একমুখী সারি বিশিষ্ট শেট
  2. অন্তর্মুখি সারি বিশিষ্ট শেট
  3. বহির্মুখী সারি বিশিষ্ট শেট
  4. গোলাকার সারি বিশিষ্ট শেট

গরু মোটাতাজাকরণ খামার স্থাপনের জমির কাঠামো ও অনান্য আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে এই চারটির যেকোন টি আপনি পছন্দ করতে পারেন।

গরুর একমুখী সারি বিশিষ্ট শেড

পারিবারিক ভাবে গরু পালন বা ছোট পরিসরে মোটাতাজাকরন গরুর খামার গড়ে তুলতে চাইলে একমুখী শেট এর বিকল্প নেই।

গরুর অন্তর্মুখী সারি বিশিষ্ট শেড

এই শেডে মোটাতাজাককরণ গরু মুখোমুখি অবস্থায় অবস্থান করে আর পেছনদিক বহির্মুখী হয়। উভয় সারির সম্মুখ দিকে খাদ্য দেওয়ার জন্য ম্যানজার বা খাবার পাত্র স্থাপন করতে হয় এবং উভয় সারির ম্যানজারের মধ্য বরাবর পরিচর্যা ও খাদ্য প্রদানের জন্য পরিচর্যাকারী চলাচলের রাস্তা থাকা জরুরি যাতে পরিচর্যাকারীর একই সাথে উভয় সারিতে খাদ্য পরিবেশন করতে পারে। গরুর পিছন বরাবর অর্থাৎ শেডের বাইরের দিকে ড্রেন থাকে।

গরুর বহির্মুখী সারি বিশিষ্ট শেড

এ ধরনের শেডে গরু একে অপরের বিপরীত মুখী অবস্থায় থাকে এবং উভয় সারির মাঝখানে পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা থাকে। দুই সারি গরুর সামনে ম্যানজার বা খাবার পাত্র ও চলার পথ থাকে। এই পদ্ধতির সুবিধা হলো গরু মুক্ত বাতাস পায়।

গরুর গোলাকার শারি বিশিষ্ট শেড

বর্তমান সময়ে গোলাকার সারি বিশিষ্ট শেড খুবই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এ ধরনের সারিতে অনেকগুলো মোটাতাজাকরণ গরু কে এক জায়গা থেকে খাবার প্রদান ও পর্যবেক্ষণ করা যায়।

গরু মোটাতাজাকরণ খামারের পরিবেশ

মোটাতাজাকরন গরুর খামারের পরিবেশ ভালো না হলে উৎপাদন ব্যহত হওয়া টা স্বাভাবিক। কেননা পরিবেশ ভালো না হলে গরুর যেমন অসুখ বিসুখ লেগে থাকবে তেমনি চিকিৎসা ব্যায় বেড়ে যাবে। খামার লোকসানে পতিত হবে। আর তাই খামার স্থাপনের সময় এর আশেপাশের পরিবেশ কেমন তা ভালোভাবে পর্য়বেক্ষন করতে হবে। সেক্ষেত্রে নিম্নোক্ত কিছু সতর্কতা অনুসরণ করতে হবে।

  • খামারে পর্যাপ্ত আলো ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
  • খামার স্থাপনের এলাকা যেন দুর্যোগপূর্ণ না হয়।
  • সেখানকার বাতাস ধুলো বালি ও দূষণ মুক্ত হতে হবে।
  • সেখানকার পরিবেশ শব্দ দুষণ মুক্ত বা নিরিবিলি হতে হবে।
  • খামার স্থাপনের জায়গা উঁচু এবং ঢালু হতে হবে।
  • খামারের আসেপাশের পরিবেশ শুষ্ক ও সুরক্ষিত রাখতে হবে।
  • খামার স্থাপনের এলাকায় পর্যাপ্ত খাদ্য ষশ্যের উৎপাদন ও মুল্য কম হতে হবে।
  • সেখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হতে হবে।

সুতারাং বানিজ্যিক ভাবে গরু মোটাতাজাকরন খামার গড়ে তুলতে উপরোক্ত নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরী। তবে আমাদের দেশের যে সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গরু মোটাতাজাকরণ খামার রয়েছে সেগুলোতে এত নিয়ম মানা না হলেও সেসকল খামারের পরিবেশ খুব বেশি খারাপ হয় না।

শুধুমাত্র বর্ষা কালে একটু সমস্যা হয়। গরু মোটাতাজাকরণ খামার ক্ষুদ্র বা বড় যেটাই হোক না কেন প্রাণীকে তার আরামদায়ক পরিবেশ দিতে পারলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।

যেখানে পালন করা হয় সেই সমস্ত জায়গায় ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। পানি ও বৃষ্টিজল যাতে গড়িয়ে চলে যায় সেই জন্য বাসস্থান সামান্য ঢালু প্রকৃতির হলে ভালো হয়। প্রতিটি গরুর জন্য ২০ বর্গফুট (৫*৪) জায়গা প্রয়োজন।

মোটাতাজাকরণ খামারে গরু ক্রয়

গরু মোটাতাজাকণ খামারে গরু ক্রয় করার সময় যে সকল বিষয় মাথায় রাখতে হবে।

  • একই বয়সী গরু কিনতে হবে।
  • একই জাতের গরু হলে ভালো হয়।
  • গরুর বয়স দেড় থেকে দুই বছর বয়সী হলে ভালো হয়।
  • অবশ্যই গরুর ক্রয় মুল্য কম হতে হবে।
  • দ্রুত বর্ধণশীল ষাড় বা সংকর জাতের ষাঁড় কিনতে হবে।
  • শারিরীক ভাবে হালকা হলেও মোটাতাজা হওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন গরু কিনতে হবে।

গরু মোটাতাজাকরণ খামারের খাদ্য ব্যবস্থাপনা

গরু মোটাতাজাকরণ খামারের খাদ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধার জন্যই একই জাত, বয়স এর গরু কিনতে হবে। গরু কে সুষম দানাদার খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। খামারে সারা বছর কাঁচা ঘাসের সরবরাহ রাখতে পরিমান মত জমিতে উচ্চ ফলনশীল ঘাস চাষ করতে হবে। অথবা কাঁচা ঘাসের পরিবর্তে ভুট্টার সাইলেজ ব্যবহার করতে হবে।

মোটাতাজাকরণ খামারের রোগ ও ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা

গরু মোটাতাজাকরণ খামারের রোগ ও ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা সাবধানতার সাথে করতে হবে। ডাক্তারের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হওয়া যাবে না। একজন সফল গরু মোটাতাজাকরণ খামারি হতে হলে অবশ্যই খামারিকে ডাক্তারের চেয়ে বেশি জানতে হবে। অবশ্যই এনথ্রাক্স ও ক্ষুরা রোগের ভ্যাকসিন প্রয়োগ করতে হগবে।

রিলেটেড পোস্ট

লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!