গরু মোটাতাজাকরণ ঔষধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি

গরু মোটাতাজাকরণ ঔষধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে এই আলোচনায় সকলকে স্বাগতম। গরু মোটাতাজাকরণ ঔষধ ও চিকিৎসা বলতে গরুকে কিভাবে রোগমুক্ত ও সুস্থ রাখতে হবে ও খাবারের রুচি বা হজম ক্ষমতা ভাল রাখা যায় সে সকল ঔষধ ও চিকিৎসা কে বুঝাই। গরু যদি পরিপূর্ণ সুস্থ থাকে এবং তাকে সুষম খাবার দেওয়া হয় তাহলে অবশ্যই সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত হবে। প্রানী স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এমন ঔষধ ব্যবহার করা যাবে না।

পরজীবি মুক্তকরণ ঔষধ ব্যবহার

গরু মোটাতাজাকরণ ঔষধ

মোটাতাজাকরণের জন্য নির্বাচিত গরুগুলো কোন রোগে আক্রান্ত কিনা তা ভালোভাবে পরীক্ষা করে সুষ্ঠু চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলতে হবে। এরপর প্রাণিকে ডি-ওয়াারমিং এর মাধ্যমে কৃমিমুক্ত করতে হবে। কারণ আমাদের দেশের প্রায় ১০০% প্রাণি কৃমিতে আক্রান্ত হয় এ জন্য প্রাণি ক্রয় করার পর অবশ্যই কৃমিনাশক ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে। এর পর ঐ প্রাণিকে ৩/৪ মাস পরপর কৃমিনাশক ঔষধ খাওয়াতে হবে।

কলিজা কৃমির জন্য- নাইট্রোনেক্স ইনজেকশন প্রতি ২০ কেজি লাইভ ওয়েটের জন্য ১ মিলি চামরার নিচে প্রয়োগ করতে হবে। এর ১০-২০ দিন পর ইনডেক্স/এলটি ভেট বোলাস খাওয়াতে হবে।

এর ৭ দিন পর আইভার ম্যাকটিন ড্রপ দিয়ে গরুর শরীরের সকল বহি পরজীবী মুক্ত করতে হবে।

গরুকে ভ্যাকসিন প্রদান

গরুকে কোন টিকা দেওয়া না থাকলে ক্রয় করার ৭ দিন পর থেকে বিভন্ন ধরনের টিকা ১৫ দিন পরপর দিতে হবে। তড়কা, ক্ষুরা, বাদলা, গলাফুলা ইত্যাদির টিকা প্রাণিকে প্রয়োগ করতে হয়। কমপক্ষে ২টি ভ্যাকসিন অবশ্যই করা উচিৎ একটি হলো তড়কা এনথ্রাক্স অপরটি ক্ষুরা বা F.M.D রোগের টিকা। গরুকে ভ্যাকসিন করতে বেশি টাকারও প্রয়োজন হয় না আবার খুব বেশি ঝামেলাও নেই। তার পরও আমাদের দেশের প্রান্তিক খামারিরা এ বিষয়ে অনেকটাই উদাসিন।

গরুর হজম শক্তি বৃদ্ধি কারক ঔষধ

গরু মোটাতাজাকরণ করতে অবশ্যই গরুর হজম শক্তি ভালো করতে হবে। পারিবারিক খামারগুলোতে দেখা যায় ছোট গরুকেও অধীক পরিমান স্টার্চ জাতীয় খাদ্য যেমন ভাত প্রদান করে এতে গরুর পাকস্থলির কার্যকারিতা কমে যায় বা হজম ক্ষমতা কমে যায়। নানা কারনে গরুর হজম ক্ষমতা কমে যেতে পারে তাই সবসময় হাতের কাছেই এসকল হজম শক্তি বুদ্ধিকারক ঔষধ রাখতে হয়।

  • এপিটাইজার– জাইমোভেট, ডিজিমিক্স, হার্রবাটপ ইত্যাদি
  • ইনজেকশন- ক্যাটাফস, এ-সল ইত্যাদি
  • প্রোবায়টিক- বায়োলাক, এসিলাক প্লাস, বায়োগাট ইত্যাদি

সুষম খাদ্য সরবরাহ

মোটাতাজাকরণ গরুকে সুষম দানাদার খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। গরুর মোট খাদ্য চাহিদার ৪০ শতাংশ দানাদার খাদ্য সরবরাহ করলে ভালো ফলাফল পাওয়। বাকী ৬০ শতাংশ রাফেজ বা আঁশ জাতীয় খাদ্য সরবরাহ করতে হবে।

মোট রাফেজের ৪০% ড্রাই রাফেজ বা খড় আর বাকী ৬০ % গ্রীন রাফেজ বা কাঁচা ঘাস সরবরাহ করতে হবে।

দানাদার খাদ্য তৈরির সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন প্রোটিন ১৮% এর নিচে না থাকে এবং ফ্যাট ৪% মিনিমাম থাকতে হবে। এর বেশি হলে ভালো হয়।

মোটাতাজাকরণে ব্যবহৃত কিছু উন্নত প্রযুক্তি

ইউ,এম,এস বা ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র এমন একটি প্রযুক্তি যার মাধ্যমে খড়ের পুষ্টিগুণ বহুগুণ বৃদ্ধি করে গরুকে কম সময়ে, কম খরচে উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। এছাড়াও সাইলেজ তৈরি করে খাওয়ালে উৎপাদন খরচ অনেক কম পড়ে ও অধিক উৎপাদন পাওয়া যায়। সারাবছর কাচা ঘাসের চাহিদা পুরন করা যায়। গরুকে তার দানাদার খাদ্যের ৪০ ভাগ ফার্মান্টেড কর্ণ সরবরাহ করলে খুব ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।

গরু মোটাতাজাকরণ ঔষধ

গরু মোটাতাজাকরণ ঔষধ বলে আসলে কোন ঔষধ আছে কি? পাঠকের কছে আমার প্রশ্ন রইলো। আমরা গরু মোটাতাজাকরণ খামারে যে সকল ঔষধ প্রয়োগ করি সেগুলো গরুকে সুস্থ্য রাখার জন্য। সরাসরি গরুর ওজন দ্রুত বৃদ্ধি করে এমন গরু মোটাতাজাকরণ ঔষধ ব্যবহার করা অত্যান্ত ঝুকির ও মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর।

এসকল ক্ষতিকর ও বিপদজনক ঔষধের মধ্যে রয়েছে স্টেরয়েড বা ডেক্সামিথাসন। স্টেরয়েড পশুর বিপাক প্রক্রিয়া ও কিডনীর কার্যক্রমে ব্যাপক নেতিবাচক পরিবর্তন তৈরী করে। ফলে পশুটির কিডনি শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি বের করে দিতে পারে না। এত গরু ফুলে যায় বা মোটা দেখায়।

স্টেরয়েড বা ডেক্সামিথাসন ট্যাবলেট ও ইনজেকশন ফর্মে বাজারে খুবই এভেলেবল। গ্রামের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও পল্লি পশু চিকিৎসক রয়েছে যারা এধরনের গরু মোটাতাজাকরণ ঔষধ ব্যবহারে খামারিকে উৎবুদ্ধ করে। এদের থেকে দুরে থাকুন। মোটাতাজাকরণ মৌসুম শুরু হলে বাজারে অনেক ধরনের গরু মোটাতাজাকরণ ঔষধ এর বিগ্গাপন দেখা যায়। এসবের প্রলভনে পড়বেন না। গরু মোটাতাজাকরণ ঔষধ নিয়ে আপনার মতামত কমেন্টে লিখুন অন্য খামারি গণ এতে উপকৃত হবে।

গরু মোটাতাজাকরণ ঔষধ তালিকা

গ্রোথ হরমোন বা স্টেরয়েড বা এন্টিবায়োটিক ছাড়াও জৈব পদ্ধতিতে শুধু সুষম খাদ্য ও হজম শক্তি বৃদ্ধি কারক ঔষধ খাওয়ায়ে গরু নিরাপদ ভাবে মোটাতাজাকরণ খুব সহজেই করা য়ায়। এ সকল ঔষধ গবাদিপশু ও মানুষের জন্য নিরাপদ। আপনারা চাইলে উন্নত দানাদার খাদ্য ও এর পাশাপাশি নিম্নক্ত গরু মোটাতাজাকরণ ঔষধ গুলি নিয়োম মেনে খাওয়ালে ভালো গ্রোথ পাবেন। আর এজন্য কনো হরমোন বা এন্টিবায়টিক ব্যবহার করতে হবে না।

প্রোবায়োটিকস, প্রিবায়োটিকস ও মিনারেল সাপ্লিমেন্টস

এগুলো জৈব পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণ ঔষধ। প্রোবায়োটিকস, প্রিবায়োটিকস ও মিনারেল সাপ্লিমেন্টস গরুর পাকস্থলির মাইক্রোফ্লোরা ও উপকারি ব্যাকটেরিয়ার উন্নতি ঘটায় বা সংখ্যা বৃদ্ধি করে।

ফলে গরুর দীর্ঘ দিন খাবারের রুচি ভালো থাকে এবং পুষ্টিগুণও শোষিত হয় ভালো ফলে গরুর বৃদ্ধি ভালো থাকে। বাজারে এধরণের প্রোবায়োটিকস, প্রিবায়োটিকস ও মিনারেল সাপ্লিমেন্টস বিভিন্ন কম্পাণির বিভিন্ন নামে পাওয়া যায়।

আপনি চাইলে এসকল নিউট্রেশনাল ঔষধ এক বা একাধিক বার গরুকে খাওয়াতে পারেন। যেমন- বায়োলাক বোলাস, এসিলাক প্লাস বোলাস, বায়োগাট পাওডার ইত্যাদি।

লিভার টনিক

গরু মোটাতাজাকরণ ঔষধ এর মধ্যে লিভার টনিক অন্যতম। মোটাতাজাকরণের গরু কৃমি মুক্ত করণের পর পর বা যেকোন সময় গরুকে এই লিভার টনিক খাওয়ানো যায়। লিভার টনিক গরু মোটাতাজা করণে ও গরু সুস্থ্য রাখতে দারুন কাজ করে। গরুর খাদ্য হজম থেকে শুরু করে মাংষ উৎপাদন পর্যন্ত অনেক অতি সুক্ষ কাজ করতে সরাসরি গরুর লিভার অংশ গ্রহণ করে। গরুর এই লিভার লালো থাকলে গরুর শরীরের সকল জৈবিক কার্যকলাপ তরান্বিত হয়। ফলে গরু থেকে অধীক উৎপাদন সম্ভব হয়। নিম্নে কিছু লিভার টনিকের নাম দিচ্ছি আপনি চাইলে যেকোন একটি এক বা একাধিক বার খাওয়াতে পারেন।

  1. হেপাএমাইন ১০০ মিলি (এসিআই এনিমেল হেল্থ)
  2. লিভা ভেট ১০০ মিলি (স্কয়ার)
  3. লিভাটন ১০০ মিলি (গ্লোব ফার্মাসিটিক্যালস)
  4. সুপারলিভ ১ লিটার (এবিআই)
  5. রেনালিভ ১ লিটার (রেনাটা)

ক্যালসিয়াম

গরু মোটাতাজাকরণ ঔষধ হিসাবে ক্যালসিয়মের ব্যবহার প্রচুর হয়ে থাকে। ক্যালসিয়াম গরুর শরীরের হাঁড়ের গঠন শক্ত, মজবুত ও মোটা করে। গরুর শারীরিক বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ষাঁড় গরু সাধারনত ঘাস ও দানাদার খাদ্য থেকে ক্যালসিয়াম গ্রহন করে। যদি পর্যাপ্ত কাঁচা ঘাসের অভাব বা দানাদের খাদ্যে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়ামের অভাব থাকে তাহলে অবশ্যই গরুকে ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট খাওয়াতে হবে। নিম্নে কিছু ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্টের নাম উল্যেখ করলাম এর যেকোন একটি খাওয়ালে চলবে।

  1. রেনাক্যাল পি, ১ লিটার ও ৫ লিটার (রেনাটা)
  2. সানক্যালভেট ওরাল, ১ লিটার ও ৫ লিটার (এলানকো)
  3. ক্যালভেট পি, ১ লিটার (এসিআই)
  4. ডিসিপি প্লাস ১ কেজি, ৫ কেজি ও ১০ কেজি (অপসোনিন)
  5. ডিসিপি গোল্ড ১ কেজি ও ৫ কেজি (এসিআই)

ভিটামিন, মিনারেল ও এমায়নো এসিড সাপ্লিমেন্ট

গরু মোটাতাজাকরণ ঔষধ এর মধ্যে এগুলি অন্যতম। গরুর শরীরে কোন একটি ভিটামিনের অভাব থাকলে আশানুরুপ উৎপাদন আসবে না। আর তাই দুই থেকে তিন মাস পর পর প্রতিটি গরুকে তিন থেকে পাঁচ দিন ভিটামিন, মিনারেল ও এমায়নো এনিড সাপ্লিমেন্ট খাওয়াতে হবে। এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং গরুর মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।

  1. রেনাভিট ডিবি (রেনাটা)
  2. মেগাভিট ডিবি (এলানকো)
  3. ক্যালফসটনিক (এসিআই)
  4. ডিবি ভিটামিন (স্কয়ার)

অনেকের ধারণা গরু মোটাতাজাকরণের জন্য বিশেষ কোন ঔষধের প্রয়োগ করতে হয়। এটা একদমই ভুল ধারনা। আসলে এ কাজের জন্য গরুকে আলাদা কোন বিশেষ কিছু খাওয়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। একটা গরুর স্বাভাবিক যে পরিচর্যার প্রয়োজন হয় এক্ষেত্রে সেটই যথেষ্ট হবে। এতেই স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়ে গরু মোটাতাজা হয়ে যাবে।গরু মোটাতাজাকরণ ঔষধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে এই আলোচনা থেকে খামারিরা কতটুক জানতে বা বুঝতে পেরেছে সেটা বুঝলে পরবর্তি পোস্ট গুলি লিখতে সুবিধা হয়। আপনার ছোট্ট মতামত আমাকে অনুপ্রানিত করে।

রিলেটেড পোস্ট
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!