গরুর পেট ফাঁপা রোগ, ঔষধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি

গরুর পেট ফাঁপা রোগ, ঔষধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি খামারিদের অবশ্যই জানা দরকার। ছাগল ও গরুর পেট ফাঁপা রোগ একটি অতি পরিচিত রোগ। রোগটি অতি সাধারণ হলেও এর ক্ষতিকর প্রভাব কিন্তু কম না। বারবার এই রোগ দেখাদিলে উৎপাদন কমে যাবে অনেক খানি। গরুর ডাইজেস্টিভ সিস্টেম কে নষ্ট করে এই রোগ। দেখা গেছে এক বার গরুর পেট ফোলা রোগ হলে ৭-১০ দিন সঠিক মাত্রায় খাদ্য গ্রহণ করে না।

পেট ফাঁপা বা পেট ফোলা কখনো কখনো এতটাই মারাত্মক হয় যে গরু বা ছাগল মারা যায়। এই রোগটি মুলত গরুর খাবার ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারনে বেশি হয়। অনেক সময় সাইলেন্ট পেট ফাঁপা রোগ হয় তেমন কোন সিমটোম থাকে না তবে গরুর খাবারের রুচি অনেক কমে যায়।

গরুর পেট ফাঁপা রোগ কী?

বিভিন্ন কারনে গরুর রুমেনে অতিরিক্ত এমোনিয়া গ্যাস তৈরি হলে রুমেনের কার্যকারিতা হ্রাস পায়। এতে ph কমতে থাকে ও গ্যাস বৃদ্ধি পেতে থাকে। গরু ছটফট করে। মুফ দিয়ে লালা ঝড়ে। কখনো কখনো প্রসাব পায়খানা বন্ধ করে দেয়। গরুর এই অবস্থাকে পেট ফাঁপা রোগ বলে।

গরুর পেট ফাঁপা রোগ

গরু ছাগলের ব্লট ও টিমপ্যানি কি

রোমন্থক পশুর পেটে অতিরিক্ত গ্যাস জমে পেট ফাঁপা বা tympany রোগ সৃষ্টি হয়। এর কারণে সৃষ্ট বদহজম ও পেট ফাঁপা জনিত অর্জীর্ণতা সৃষ্টি হয়। সাধারণ ভাষায় বলতে গেলে পেটে শুধু মুক্ত গ্যাস জমা হলে তাকে টিমপানি এবং ফেনাযুক্ত গ্যাস বুদবুদ আকারে পেটে জমা হলে তাকে ব্লট বলে। ব্লট হোক আর টিমপ্যানি চিকিৎসা পদ্ধতি কিন্তু একই।

ব্লট বা টিম্পনি হওয়ার কারন

সাধারণত দেখা যায় খাদ্যের ত্রুটির কারণেই টিমপানি রোগ হয়। খাদ্যনালীর স্বাভাবিক কার্যক্রম বাঁধাগ্রস্থ হলে, রুমেনের গতিশীলতা হ্রাস পেলে, পশুর দেহের অভ্যন্তরে উৎপন্ন গ্যাসের পরিমাণ থেকে সঠিক পরিমাণে বের হতে না পাড়লে টিমপ্যানি রোগ হয়।

অতিরিক্ত লিগুমিনাস জাতীয় ঘাস যেমন- সীম, মটর, খেসারী প্রভৃতি অধিক পরিমান খেলেও এই রোগ হয়।

অধিক কার্বোহাইড্রেট যুক্ত খাদ্য খেলে ব্লোট রোগ সৃষ্টি হয়। চারনভূমিতে অধিক ইউরিয়া সার প্রয়োগ, খাদ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও নাইট্রোজেন প্রদান করলে এ রোগ সৃষ্টি হয়।

ছাগলের বা গরুর পেট ফাঁপা রোগ কেন হয়?

গবাদিপশুর গলায় কিছু আটকে গেলে এবং অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করলে,বদ হজম হলে ও রুমেনের গতিশীলতা হ্রাস পেলে এই রোগটি সাধারণ হয়ে থাকে। আর তাই গবাদিপশুর খাদ্য ব্যবস্থাপনা সতর্ক ও বিচক্ষণতার সাথে করতে হবে। গরুর জন্য সহজে হজম হয় এমন খাদ্য দিতে হবে। গরুর খাবারে ফাইবার খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাই ফাইবারের মান ঠিক রাখতে হবে।

গরুর পেট ফাঁপা রোগের লক্ষণ সমূহ

  • জাবরকাটা বন্ধ হয়ে যায়।
  • পশুটি খাবারের চেষ্টা করে তবে আক্রান্ত পশু কিছু খেতে যায় না।
  • আক্রান্ত পশুটি বার বার উঠবস করে।
  • মুখ দিয়ে লালা পড়ে।
  • শরীল দিয়ে ঘাম বের হয় এবং মাঝেমাঝে জিব্বা বাহির করে শ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণের চেষ্টা করে।
  • বাম দিকের পেট ভীষণ ভাবে অনেক সময় ফুলে ওঠে।
  • শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
  • অনেক সময় পায়খানা প্রস্বাব বন্ধ করে দেয়।
  • অতি তীব্র পেট ফাঁপা হলে আক্রান্ত পশু শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা ও যায়।

গরু ছাগলের ক্রনিক ব্লট

খামারিকেই গরুর পেটফাঁপা বা গ্যাসের সমস্যায় মাঝেমধ্যেই পড়তে হয়। আর এই সমস্যা যদি একটি গরুর নিয়মিত হতে থাকে তখন তাকে ক্রনিক ব্লটি বলে। এ সমস্যায যদি নিয়মিত হয় তাহলে খামরির পথে বসতে বেশি সময় লাগার কথা না। এটি হয়ই মূলত গরুর পাকস্থলি তে অতিরিক্ত গ্যাস জমে গেলে।

বিভিন্ন প্রকার ঔষধ প্রয়োগ করে এই গ্যাস বা ব্লট নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও দুয়েক দিনের মধ্যে আবার সমস্যা ফিরে আসে। একেই বলে ক্রনিক ব্লট। এটি হলে গরু দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। দুধের গাভী হলে দুধ একেবারে কমে যায়। এ সমস্যায় ত্বরিৎ ব্যবস্থা না নিলে খামারিকে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হয়।

কোনো কারণে রুমেনের মাইক্রোফ্লোরা বা উপকারী অণুজীবের চরিত্র ও প্রজাতির বদল ঘটলে বা কোনো কারণে রুমেনের মাইক্রোফ্লোরা বা উপকারী অণুজীব মারা গেলে রুমেনের কার্যকারিতা কমে যায় ও অতিরিক্ত গ্যাস তৈরি হয়। রুমেনের মাইক্রোফ্লোরা বিভিন্ন কারণে মারা যেতে পারে। যেমন হঠাৎ করে খাবার পরিবর্তন, অসুস্থতা এবং দীর্ঘক্ষণ অভুক্ত থাকলে এসব উপকারী অনুজীব মারা যেতে পারে।

গরুর পেট ফোলা রোগের প্রতিকার

এই রোগের একমাত্র প্রতিকার প্রাণীর সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা। প্রাণীর খাদ্য ব্যবস্থাপনার প্রতি নজর রাখতে হবে। গরুর পরিপাকতন্ত্র উন্নত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখতে হবে। সময় মত সঠিক নিয়মে পশুকে কৃমি মুক্ত করতে হবে। গবাদিপশুর ওজন বুঝে আদার রস ১০০-১৫০ গ্রাম অথবা প্রয়োজনে আরো কম ও বেশি এবং সাথে খাবার সোডা (সোডিয়াম বাইকার্বোনেট) ওজন বুঝে ২ চামচ থেকে ৫ চামচ প্রয়োজনে কম ও বেশি খাওয়াতে হবে। এই ফরমূলা পেট ফাঁপার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঔষুধ এবং গর্ভকালেও নিরাপদ।

গরুর পেটে গ্যাস হলে করণীয়

গরুর পেটে গ্যাস বা গরুর পেট ফাঁপা রোগ হওয়াটা একটি নিত্য নৈম্যত্তিক ব্যাপার। এটি মুলত হয় খাদ্য ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি-বিচ্যুতি বা পরিবর্তনের কারনে। দেখা যায় কাঠাল পেকেছে কেও খাচ্ছে না? কোন সমস্যা নাই গরু আছে না? হঠাৎ করে একদিন এই হাই কার্বহায়ড্রেট খাদ্য গরু খেযে ব্যস, এবার ডাক্তার ডাক। প্রীয় খামারি গরুর খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাস কখনোই হঠাৎ করে পরিবর্তন করা যাবেনা। গরুকে অধীক স্টার্চ জাতীয় খাদ্য যেমন ভুট্টা, গম, চাইল বা ভাত ইত্যদি খুব কম পরিমানে খাওয়াতে হবে। যদি গরুর পেটে গ্যাস হয়ে যায় তাহলে কী করবেন?

সাধারণ পটে গ্যাস জনীত সমস্যায় খাবারে অরুচি তৈরি হলে যে কোন এপিটাইজার যেমন- জাইমোভেট পাওডার বয়স ও ওজন অনুযায়ী খাওয়ালে গ্যাস ভা্লো হয়ে যায় এবং গরু ভালোভাবে খাওয়া দাওয়া করতে থাকে।

গরুর পেট ফাঁপা রোগ বা পেটে গ্যাস বেশি হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রাথমিক চিকিৎসা হিসাবে নো ব্লট / ব্লট স্টপ ওরাল সলুসন ১০০ মিলি খাওয়ানো যেতে পারে এর সেমিথিকন পেটের জমা হওয়া কে শোষণ করে। আর ডিল ওয়েল গরুর রুমেনের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে এবং গরুর পায়খানার রাস্তা পিচ্ছল করে দেয় ফলে গরুটি পায়খানা করে ফেলে। এতে গ্যাস বের হয়ে যায়। গরুর পেটে গ্যাস হলে করণীয় অনেক ঔষধ ও চিকিৎসা রয়েছে। এগুলোর কিছু সার সংক্ষেপ নিম্নে আলোচনা করা হলো।

গরুর পেটে সমস্যা হলে করনীয়

ফুড পয়োজনিং, স্টার্চ জাতীয় খাদ্য অধীক পরিমানে গ্রহণ, খাদ্যাভ্যাস হঠাৎ করে পরিবর্তন ইত্যাদি কারণে গরু বা ছাগলের পেটে সমস্যা হওয়াটা খুবই পরিচিত ঘটনা। আমরা সহজেই এই ভুল গওলো করে থাকি। এমন কি সমস্যা বেশি না হওয়া পর্যন্ত আমরা ডাক্তার ডাকি না। এ কারণে অনেক সময় গরু মারা যায়। আর এজন্য গরুকে নিয়মিত দুই বেলা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। হাতের কাছেই পেটে সমস্যা জনিত ঔষধ রিজার্ভ রাখতে হবে।

ছাগলের বা গরুর পেট ফাঁপা রোগের চিকিৎসা

ছাগলের পেট ফাঁপা চিকিৎসা সকল ছাগল পালন খামারির জানা থাকা দরকার। ছাগলের বা গরুর পেট ফাঁপা রোগ এর চিকিৎসায় বিভিন্ন রকমের হজম শক্তি বৃদ্ধিকারক মেডিসিন ব্যবহার করতে হয়। সুতরাং বিভিন্ন রকমের হজম শক্তি বৃদ্ধিকারক ঔষুধ আপনার খামারে এনে রাখুন জরুরী সময়ে প্রয়োজনে লাগতে পারে।

রুমেনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি কারক সাসপেনশন

  • ব্লট ষ্টপ ভেট ওরাল সলুশন
  • নো ব্লট ভেট ওরাল সলুশন
  • জিরো ব্লট ভেট ওরাল সলুশন
  • ম্যাগভেট প্লাস ওরাল সলুশন

রুমেনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি কারক পাউডার

  • বভিকেয়ার (একমি)
  • রুমেনই প্লাস (এফএনএফ)
  • জাইমোভেট (একমি)
  • ডিজিম্যাক্স (স্কয়ার)
  • ডিজিটোন

রুমেনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি কারক ট্যাবলেট

  • রুমেনটন
  • বায়োকাড্ এক্সপি
  • রুমকিওর ট্যাবলেট, ইত্যাদি।

গরুর পেট ফাঁপা রোগ বা গ্যাস হওয়া রোগের ঔষধ

  1. এপিটাইজার বা রুচির পাওডার– সাধারণ পেট ফাপা বা গ্যাস হওয়ার সমস্যায় এই এপিটাইজার ই কার্যকর। দেখাযায় একটি ১০০ কেজি ওজনের গরুকে সকালে ১০ গ্রামের একটি স্যাচেট ও বিকালে ১০ গ্রামের একটি স্যাচেট খাওয়ালেই গরু ভালো হয়ে যায়।
  2. বভি কেয়ার বা বভি ভেট- এটি ১২৫ গ্রাম স্যাচেটে পাওয়া যায। এটি প্রায় সকল ভেটেরিনারী কম্পাণিই মার্কেটিং করে। এটি খাওয়ালে দ্রুত গ্যাস শোষিত হয় এবং গরু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়।
  3. ব্লপ স্টপ/জিরো ব্লট- গবাদিপশু হঠাৎ করে স্টার্চ জাতীয় খাদ্য বেশি খেলে তার পেট ফুলে যায় বা গরুর পেট ফাঁপা রোগ হয়। পশুটি প্রশ্রাব ও পায়খানা বন্ধ করে দেয়। এ অবস্থায় দ্রুত সমাধান না করতে পারলে পশুটি মারা যায়। এসকল ক্ষেক্রে এই ছিরাপ ব্যবহার করা হয়। এটি খাওয়ালে পশুর গ্যাস কমে যায় এবং পশুটি প্রশ্রাব ও পায়খানা করে।
  4. এন্টাসিড/এন্টাসিড প্লস- মানুষের এন্টাসিড বা এন্টাসিড প্লাস খামরিরা অনেক সময় গবাদিপশুতে ব্যবহার করে। এবং সাধারণ সমস্যায় এই ঔষধ ভালো কাজ করতে দেখা যায়।

সুতরাং ছাগলের বা গরুর পেট ফাঁপা রোগে আক্রান্ত পশুর ওজন অনুযায়ী সাসপেনশন,পাউডার বা ট্যাবলেট ব্যবহার করলেএই রোগমুক্ত হয়। খামারি গরুর খাদ্য ব্যবস্থাপনা ভালো ভাবে করতে না পারলে খামারে প্রায়ই এই রোগ দেখা দেবে। আর তাই আপনার খামারের খাদ্য ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিন গরুর পেট ফাঁপা রোগ আসবে না।

আরো পড়ুন-

  1. বাছুরের রক্ত আমাশয় বা ককসিডিওসিস রোগ
  2. গরুর এফএমডি বা ক্ষুরারোগ
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!