কোয়েল পাখি

কোয়েল পাখি (Quail)

কোয়েল পাখির (Quail) আদি নিবাস জাপান। এজন্যই এই পাখিকে জাপানিজ কোয়েল পাখি ও বলা হয়ে থাকে। এই পাখি দেখতে সুন্দর না হলেও এর ডিম এবং মাংস খুব সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। অর্থনৈতিক দিয়ে চিন্তা করলে দেখা যায় কোয়েল পাখি পালন অত্যন্ত লাভজনক। কেননা এদের খাদ্য খুব এবং অন্যান্য পালন কম। এই পাখি মাত্র 6 সাত সপ্তাহের মধ্যে ডিম দেওয়া আরম্ভ করে।

বাংলাদেশ ঢাকা সাভার মানিকগঞ্জ সহ অন্যান্য থানায় কোয়েলের খামার গড়ে উঠেছে। পৃথিবীতে বহু প্রজাতির পাখি রয়েছে। গৃহপালিত হিসেবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে শুধু জাপানি এবং প্রজাতির কোয়েল পাখি পালন করা হয়। জাপানিজ কোয়েলের ডিম এবং মাংস উৎপাদনের জন্য পালন করা হলেও কোয়েল মূলত মাংস উৎপাদনের জন্য পালন করা হয়।

বিজ্ঞানীদের মতে,  সর্বপ্রথম জাপান, চীন বা করিয়াতে জাপানি কোয়েলকে পোষ মানানো হয়। অন্যদিকে, বব হোয়াইটকোয়েল এর উৎপত্তি আমেরিকায়। বর্তমানে বিশ্বের বব হোয়াইট কোয়েল অপেক্ষা জাপানি কোয়েল (Japanese Quail) পালনে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। জাপানি কোয়েল পাখি পোল্ট্রিশিল্পের ক্ষুদ্রতম সদস্য।

কোয়েল পাখির জাত / উপজাত

বাণিজ্যিক জাপানি কোয়েল এর অনেকগুলো জাত ও উপজাত রয়েছে।  জাত ও উপজাত ভেদে এদের গায়ের রং, ওজন, আকার-আকৃতি, ডিম পাড়ার হার, ডিমের ওজন ইত্যাদিতে বেশ পার্থক্য হয়ে থাকে।

লেয়ার কোয়েল

বর্তমান পৃথিবী পাঁচটি উপজাত উপজাতের লেয়ার কোয়েল বেশ জনপ্রিয়। যেমন-

  1.  ফারাও
  2. ব্রিটিশ রেন্জ
  3. ইংলিশ হোয়াইট
  4. ম্যানচুরিয়ান গোল্ডেন
  5. টুক্সেডো

এই পাঁচ উপজাতের কোয়েল পাখির মধ্যে প্রজনন ঘটিয়ে নানা বর্ণে কোয়েল তৈরি করা যায়। এগুলোর মধ্যে ফারাও উৎকৃষ্টতর। বিশ্বব্যাপী এর কদর বেশি।

লেয়ার কোয়েল পাখির বৈশিষ্ট্য

  1. জাপানি কোয়েল ছোট খাটো ও গাট্টা-গোট্টা পাখি।
  2. এদের ঠোঁট, ঘাড় ও পা খাটো এবং লেজ ছোট।
  3. পালকের তুলনায় দেহ বেশ ভারী।
  4. ঠোটের লাগা থেকে নিজের ডগা পর্যন্ত একটি কোয়েল গড়ে 17.5 সেন্টিমিটার লম্বা হয়।
  5. জাত ভেদে এদের ওজন 150 থেকে 200 পর্যন্ত হতে পারে। তবে আমাদের দেশে আনা পুরুষ ও স্ত্রী কোয়েল গুলোর ওজর যথাক্রমে 120 থেকে 130 গ্রাম এবং 140 থেকে 150 গ্রাম হয়ে থাকে। 
  6. কোয়েলের ডিম গুলো অত্যন্ত সুন্দর। ডিমের খোসার রং গাড় হলদে থেকে হালকা বাদামি। খোসার রং এর উপর থাকে অসংখ্য ছোট-বড় নীল, বেগুনি, খয়েরী বা চকলেট রংয়ের কারুকাজ। বিভিন্ন জাতের কোয়েলের ডিমের কারুকাজ বা কারুকাজের রং বিভিন্ন রকম হয়।
  7. কোন কোন লাইনের কোয়েল পাখি বছরে ২৯০ থেকে ৩০০ টি ডিম পাড়ে।
কোয়েল পাখি

ফারাও জাতের কোয়েল পাখির বৈশিষ্ট্য

  1. এদের পালকের রং হুবহু বুনো জাপানি কোয়েল এর মত।
  2. এদের পালকের রং বাদামী। তবে সারা গায়ে গাড় চকলেট বা কালো রঙের ছোপ থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ গুলোর বুকের উপর অংশে হলদে বাদামে এবং নিচের অংশে হালকা বাদামি, আর মুখমন্ডলের রং খয়েরী।
  3. স্ত্রী গুলোর মুখমন্ডল, ঘাড় ও বুকের উপরের অংশ বাদামী। বুকের উপরের অংশের এ বাদামী রঙের উপর কালো বা খয়েরী গোলাকার ফোটা থাকে এবং বুকের নিচের অংশটা তামাটে।
  4. সদ্য ফোটা ছয় থেকে সাত গ্রাম ওজনের বাচ্চাগুলোর গায়ের কোমল পালকের রং হলদে। এর উপর কালো রঙের ছোপ থাকে।
  5. এরা 6 থেকে 7 সপ্তাহ বয়সে ডিম পাড়া শুরু করে। 8 সপ্তাহের উৎপাদন 50 পার্সেন্ট এ পৌছায়। 10 সপ্তাহের তা বেড়ে 80 পার্সেন্ট হয় এবং 15 সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে (৯০%) উৎপাদন পৌঁছায়।
  6. এরা 75 পার্সেন্ট ডিম বিকেল ৩ টা থেকে ৬ টার মধ্যে এবং বাকি 25 পার্সেন্ট সাধারণত এর পরে দেয়।

ব্রাউন কোয়েল পাখির বৈশিষ্ট্য

  1. এদের পালকের রং ফারাও কোয়েলের মতই কিন্তু রঙ একেবারেই হালকা, কোন কালচে ভাব নেই। তবে পুরুষগুলোর মুখমণ্ডলের নং ফারাও উপজাতির থেকেও তুলনামূলকভাবে বেশি খয়রি।
  2. বাচ্চাগুলোর কোমল পালকের রং হলদেভ তবে এ হলুদের উপরের ছোপগুলো তুলনামূলকভাবে হালকা।
  3. এরা অত্যন্ত শান্ত প্রকৃতির পাখি। ফারাও কোয়েলের মত মারামারি ঠোকরা-ঠুকরি করে না। এছাড়া বাকি সব বৈশিষ্ট্য ফারাও কোয়েলের মত।

ব্রয়লার কোয়েল

ব্রয়লার কোয়েল পাখির মাংস অত্যন্ত নরম ও সুস্বাদু। এগুলো অত্যন্ত উঁচু দরের খাদ্য হিসাবে বিবেচিত হয়। 5 সপ্তাহ বয়সের একটি ব্রয়লার কোয়েল পাখির ওজন 140 থেকে 150 গ্রাম হয়। এগুলো থেকে 72.5% খাওয়ার উপযোগী মাংস পাওয়া যায়।

কোয়েল পাখি ও ডিম
চিত্র: কোয়েল পাখি ও ডিম

কোয়েল পালনের সুবিধা

  1. এরা আকৃতিতে ছোট বলে সহজেই আবদ্ধ অবস্থায় এবং অল্প জায়গায় অধিক সংখ্যক পালন করা যায়।
  2. কোয়েলের খামার এর প্রারম্ভিক খরচ কম হওয়ায় যে কেউ অল্প পুজিতে ছোটখাটো খামার দিয়ে ব্যবসা শুরু করতে পারে।
  3. আবদ্ধ অবস্থায় 0.91 বর্গমিটার জায়গায় 6 থেকে 8 টি কোয়েল পালন করা যায়।
  4. ডিম থেকে চার পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে এরা পূর্ণবয়স্ক পাখিতে পরিণত হয়।
  5. এ বয়সের বয়লার কোয়েলের বাজারজাত করা যায়।
  6. 6 থেকে সাত সপ্তাহ বয়সে লেয়ার কোয়েল ডিম পাড়া শুরু করে।
  7. এদের ডিম পাড়ার হারও খুব বেশি 290 থেকে 300 টি প্রতি বছর।
  8. এদের মাংস ও ডিম অত্যন্ত সুস্বাদু। এগুলো উচু দরের খাদ্য হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
  9. বয়লার 72 দশমিক 5 ভাগ মাংস হিসেবে খাওয়া যায় অর্থাৎ 140 থেকে 150 গ্রাম ওজনের একটি থেকে প্রায় 100 থেকে 110 গ্রাম খাওয়ার উপযোগী মাংস পাওয়া যায়।
  10. এদের বেঁচে থাকার হার মুরগির তুলনায় বেশি অর্থাৎ এদের রোগবালাই কম হয়। তাই মুরগির মত এদের পিছনেও বেশি টাকা খরচ করতে হয় না।
  11. কোয়েলকে কোন টিকা দিতে হয় না এবং কৃমির ওষুধ খাওয়াতে হয় না।
  12. এদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্যান্য অনেক গুণ বেশি।
  13. এদের পিছনে খাদ্য বাবদ খরচ কম। একটি প্রাপ্তবয়স্ক কোয়েল গড়ে প্রতিদিন মাত্র 20 থেকে 25 গ্রাম খাদ্য খায়।
  14. এদের খাদ্য রূপান্তর এর দক্ষতা ও ভালো 3.31 অর্থাৎ তিন কেজি খাদ্য খেয়ে এক কেজি উৎপাদন দেয়।
  15. এরা সাধারণত কুঁচে হয় না।
  16. এদের ডিমের কুসুম এর পরিমান অন্যান্য পোল্ট্রির ডিম এর তুলনায় বেশি।
  17. এদের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটার সময় কম অর্থাৎ ডিম থেকে বাচ্চা বের হতে 17 থেকে 18 দিন সময় লাগে।

আরো পড়ুন: তিতির পাখি

Leave a Comment

Your email address will not be published.